মেহেরপুর প্রতিনিধি:
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার মোহাম্মদপুর থেকে হোগলবাড়িয়া পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তা নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রীর ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর উপজেলা প্রকৌশলী ফয়সাল হোসেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের কমিশন নিয়ে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার নির্মাণকাজ চলছে, তবে ব্যবহৃত ইট, খোয়া ও অন্যান্য সামগ্রী নিম্নমানের। কাজটি বাস্তবায়ন করছে কুষ্টিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রাকিব ট্রেডার্স। প্রকল্পের চুক্তিমূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা। এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘ ৯ মাস ধরে খনন করে ফেলে রাখা রাস্তা সম্প্রতি পুনরায় নির্মাণ শুরু হলেও তাতে ব্যবহার করা হচ্ছে ৩-৪ নম্বর ইট ও নিম্নমানের খোয়া।
স্থানীয় কৃষক মোহাম্মদ হামিদুল ইসলাম বলেন, “নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করায় এটি বেশিদিন টিকবে না। আগেও ৩-৪ নম্বর ইট ব্যবহার করা হচ্ছিল, তবে এলাকাবাসীর প্রতিবাদে এখন ২ নম্বর ইট ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু তারপরও মান যথেষ্ট ভালো নয়।”
আরেক কৃষক শিপন আহমেদ জানান, “রাস্তার কাজ বন্ধ থাকায় গত ৯ মাস ধরে আমাদের কৃষি কাজে অসুবিধা হচ্ছে। মাঠের ফসল পরিবহনে প্রচুর সমস্যা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা এক বিঘা জমির ফসলের দাম ৭-১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কম দিচ্ছেন, কারণ রাস্তা খারাপ থাকায় তারা অতিরিক্ত খরচের হিসাব কষছেন।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার জানান, প্রকল্পের অনুমোদিত সিডিউল অনুযায়ী ভালো মানের সামগ্রী দিয়ে কাজ করা সম্ভব হয় না, কারণ প্রকৌশলীরা কমিশন দাবি করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার বলেন, “উপজেলা প্রকৌশলী ফয়সাল হোসেনকে ০.৫০% এবং জেলা এলজিইডি প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেনকে ২% কমিশন দিতে হয়। যদি না দিই, তাহলে নানারকম তালবাহানা করে বিল আটকে রাখা হয়।”তিনি আরও জানান, “ঠিকাদার হিসেবে আমাদের ইচ্ছা ভালো কাজ করার, কিন্তু প্রকৌশলীদের কমিশন মেটানোর পর ভালো মানের সামগ্রী কেনা সম্ভব হয় না। তারা নিজেরাই আমাদের নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে দেন।”
রাস্তার মান নিয়ে প্রশ্ন করলে মোহাম্মদপুর-হোগলবাড়িয়া রাস্তার তদারককারী উপসহকারী প্রকৌশলী অঞ্জনা খাতুন জানান, “নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়ার পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সেগুলো সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে। তারা ইট ও খোয়া তুলেও নিয়েছে। এখন আর নিম্নমানের কোনো সামগ্রী নেই। তবে যদি নতুন করে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়, তাহলে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
গাংনী উপজেলা এলজিইডি প্রকৌশলী ফয়সাল হোসেন তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমি কোনো ঠিকাদার থেকে কমিশন নিই না। শুধু আমার নাম কেন বলা হচ্ছে? জেলা প্রকৌশলী কাজের প্রতিটি সিডিউলে কত শতাংশ নেন, সেটাও তো আপনারা বলেন না। রাস্তার নিম্নমানের সামগ্রী সরিয়ে নিতে ইতোমধ্যে চিঠি দেওয়া হয়েছে।”
মেহেরপুর জেলা এলজিইডি প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে, তিনি ফোন ধরেননি। একইভাবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশিদ মিয়াকেও একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
এদিকে, স্থানীয়দের দাবি, শুধু রাস্তার সামগ্রী সরিয়ে নিলেই হবে না, পুরো কাজের তদারকি করতে হবে এবং প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে।
এলাকাবাসী ও সচেতন নাগরিকরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

Discussion about this post