স্টাফ রিপোর্টার : টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। কোথাও কোথাও পানি কমতে শুরু করলেও এখনো অনেক এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সরবরাহ, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়ে গেছে।
একই সময়ে বেনাপোল স্থলবন্দরে জলাবদ্ধতার কারণে আমদানিকৃত বিপুল পরিমাণ পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে, সুনামগঞ্জে নদ-নদীর পানি কিছুটা কমলেও বন্যার ঝুঁকি এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
চট্টগ্রামে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি
টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি উপজেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১৭৬টি ইউনিয়নের প্রায় ১ লাখ ৮৯ হাজার পরিবারের ৭ লাখ ৫৪ হাজারের বেশি মানুষ বন্যাকবলিত হয়েছেন। এ দুর্যোগে অন্তত ১০ জনের মৃত্যু এবং ১০ জন আহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিভাগ।
সাতকানিয়া উপজেলায় প্রায় সব ইউনিয়ন ও পৌর এলাকার গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, পৌর এলাকায় পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করলেও নিম্নাঞ্চলে নতুন করে পানি জমছে। ফলে অনেক এলাকার মানুষের দুর্ভোগ এখনো অব্যাহত রয়েছে।
সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়া এবং ডলু নদীর বাঁধ ভেঙে নতুন করে পানি প্রবেশ করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। চট্টগ্রাম-বান্দরবান সড়কের কয়েকটি অংশ এখনো পানির নিচে থাকায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কিছু এলাকায় পানি কমলেও নৌকা এখনো প্রধান যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় মোবাইল নেটওয়ার্কেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। এতে দুর্গত এলাকার প্রকৃত পরিস্থিতি জানতে প্রশাসনকে বেগ পেতে হচ্ছে।
বাঁশখালী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পানি কমতে শুরু করলেও বহু মানুষ এখনো পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। প্রশাসন বিভিন্ন স্থানে রাস্তা কেটে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় প্রায় ৫৫ হাজার মানুষ এখনো পানিবন্দি রয়েছেন, যা আগের দিনের তুলনায় বেশি।
বান্দরবানে বিচ্ছিন্ন জনপদ, ত্রাণ পৌঁছানো কঠিন
বান্দরবানে সাঙ্গু, মাতামুহুরী ও বাঁকখালী নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। অনেক এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।
আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও বিজিবির পক্ষ থেকে ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে। তবে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার অনেক জায়গায় এখনো প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
রাঙামাটিতে ব্যাহত সড়ক যোগাযোগ
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি, লংগদু, বরকল ও বিলাইছড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা অব্যাহত রয়েছে। বাঘাইছড়িতে পাহাড়ধসে কয়েক কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এর ফলে খাগড়াছড়ি হয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামের সঙ্গে রাঙামাটির সড়ক যোগাযোগ সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
খাগড়াছড়িতে উন্নতি, কিছু এলাকা এখনো পানির নিচে
খাগড়াছড়িতে বৃষ্টি কমে যাওয়ায় চেঙ্গী নদী ও আশপাশের খালের পানি কমতে শুরু করেছে। অধিকাংশ সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে।
তবে ছোট মেরুং ইউনিয়নের হাজারো পরিবার এখনো পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে।
কক্সবাজারে বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যের সংকট
কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া, রামুসহ বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চল এখনো পানির নিচে রয়েছে। পানি ধীরে ধীরে কমলেও অনেক এলাকায় বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ কার্যক্রম চালানো হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রয়োজনের তুলনায় সহায়তা এখনো অপ্রতুল।
বেনাপোল বন্দরে জলাবদ্ধতায় ক্ষতির আশঙ্কা
এক দিনের টানা বৃষ্টিতে দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলের বিভিন্ন শেডে হাঁটুপানি জমে যায়। এতে আমদানিকৃত বিপুল পরিমাণ পণ্য পানিতে ভিজে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিনের দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী করেছেন। বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পাম্পের মাধ্যমে পানি সরানোর কাজ চলছে। পাশাপাশি জলাবদ্ধতা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সুনামগঞ্জে পানি কমলেও বন্যার শঙ্কা রয়ে গেছে
সুনামগঞ্জে গত ২৪ ঘণ্টায় সুরমা নদীর পানি কিছুটা কমেছে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, বন্যার ঝুঁকি এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।
সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে এবং একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু রাখা হয়েছে।
এদিকে, চট্টগ্রামসহ ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। দুর্গত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত থাকলেও মানুষের প্রধান প্রয়োজন এখন নিরাপদ আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার এবং দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করা।
আর//দৈনিক দেশতথ্য// ঢাকা।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post