মোমেছুর রহমান, কুষ্টিয়া:
সুপ্রীম কোর্টের নির্দেশের পর আজও বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের আখড়া (মাজার) পরিচালনার দায়িত্ব বাউলদের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি।
সুপ্রীম কোর্টে গত ২০০৪ সালের ১১ ফেব্রয়ারী লালন মাজারের পরিচালনার দায়িত্ব বাউলদের সংগঠন লালন মাজার শরীফ ও সেবা সদন কমিটির কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেয়।
এরশাদের শাসনামলে লালনের মৃত্যুবার্ষিকীর অনষ্ঠানে লালন আখড়া বাউলদের নিকট থেকে তৎকালীন লালন একাডেমী দখল করে নেয়। মাজার পরিচালনার দায়িত্ব ফিরে পেতে ১৯৮৫ সালে বাউলরা আদালতের শরণাপন্ন হন। দীর্ঘ ১৯ বছর আইনি লড়াই শেষে সুপ্রীম কোর্ট লালন মাজারে বাউলদের অধিকারের স্বীকৃতি দিয়ে লালন আখড়া বাউলদের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেন। লালন ফকিরের মাজারের দখল নিয়ে সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগের রায় সম্পর্কে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজ্ঞ একজন ব্যারিস্টার বলেন, সংবিধান অনুযায়ী সকলকে সুপ্রীম কোর্টের নির্দেশ মানতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে লালন মাজারের দখল ও স্বত্ব নিয়ে সুপ্রীম কোর্টের রায় বাস্তবায়ন করা উচিৎ। লালন মাজারে বাউলদের নৈতিক ও ঐতিহাসিক অধিকার রয়েছে। সুপ্রীম কোর্টের এই রায়ের ফলে লালন আখড়ায় বাউলদের আইনগত অধিকারও স্বীকৃতি পেয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এছাড়াও কুষ্টিয়া জজ কোর্টের শরিয়াহ্ বিশেষজ্ঞ আইনজিবী হাবিবুল্লাহ্ ফারুকী বলেন, লালনের আখড়া বাড়ী নিয়ে মামলাটি জমি নিয়ে সাধারণ মামলা নয়। এটি মূলত ফকির বনাম দখলদারদের লড়াই। সমস্যা শুরু হয় মূলত বাউল সম্রাট ফকির লালনশাহ ওফাতের পরে। তার জীবনদশায় প্রায় সাড়ে ১৬ বিঘা জমিদান করেছিলেন ভক্ত মলমশাহ্ কারীগর। সেখানে বাউল ফকিররা তার মাজার দেখাশোনা করতো এবং সাধু সঙ্গ করতো। ১৯৮৪ সালে সামরিক শানসের সময় স্থানীয় প্রভাবশালী মহল লালন একাডেমী নামে একটি সংগঠন তৈরী করে। অভিযোগ আছে তারা লাঠিয়াল বাহীনিদ্বারা প্রকৃত ফকিরদের লালন আখড়া থেকে উচ্ছেদ করে দেয়। এরপর থেকে মাজারকে পিকনিক স্পট ও ব্যবসা কেন্দ্রতে পরিনত করা হয়। প্রকৃত ফকিরদের পক্ষে ফকির আনোয়ার হোসেন মন্টু শাহ্ লালন মাজার রক্ষা ও সেবা সদন কমিটি করে আদালতে যান। হাইকোর্ট প্রকৃত ফকিরদের পক্ষে রায় দেন। তিনি আরও বলেন, আফসোস হাই কোর্টের নির্দেশ থাকলেও ফকিররা মাজারে জায়গা পাচ্ছেননা। সুপ্রিম কোর্টের চুড়ান্ত রায়ে ফকিরদের দখলকে বৈধতা দেন এবং একাডেমীর দখলকে অবৈধ বলে। প্রভাবশালী রাজনৈতিক সিন্ডিকেট রায় উপেক্ষা করে অবৈধভাবে তারা তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে মাজার পরিচালনায় ফকিরদের কোনো ভূমিকা নেই। দানের কোটি কোটি টাকা একাডেমীর তহবিলে যায়। মেলার সময় প্রকৃত সাধুরা মাজারের বাইরে অবস্থান করে থাকে। যথাযত কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন দলমত নির্বিশেষে, ধর্মবর্ণ এর ঊর্দ্ধেউঠে সুপ্রীম কোর্টের রায়কে বাস্তবায়ন করা উচিৎ বলে আমি মনেকরি।
১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর ফকির লালন সাঁইয়ের মৃত্যুর পর থেকে বাউলরা আখড়ায় দুটি বাৎসরিক অনুষ্ঠান পালনসহ মাজার পরিচালনা এবং ভূমিকর পরিশোধ করে আসছিল। এর পরবর্তী সময় থেকে লালন একাডেমী ভূমিকর দিচ্ছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে আইয়ুব খানের শাসনামলে আমলে সরকার লালন ফকিরের গান সংগ্রহ ও গবেষণার জন্যে লালন মাজার চত্বরে লালন লোকসাহিত্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে লালন লোকসাহিত্য কেন্দ্রের নাম পরিবর্তন করে লালন একাডেমী করা হয়। এরশাদের শাসনামলে লালন একাডেমী বাউলদের মাজার থেকে পিটিয়ে বের করে দিয়ে লালন মাজার দখল করে নেয়। ১৯৮৪ সালের ১৭ অক্টোবর তৎকালীন জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমীর সভাপতি লালন মাজারে ধর্মসভা এবং এর পাশাপাশি বে-শরিয়তি পথ থেকে ফিরে আসতে বাউলদের জন্যে তওবা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। ওই সময় উপস্থিত বাউল ফকিররা জেলা প্রশাসকের আদেশ অমান্য করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করলে জেলা প্রশাসক লাঠি চার্জের নির্দেশ দেন। রিজার্ভ পুলিশ লালন ভক্তদের বেদম প্রহার করে মাজারের সীমানা থেকে বের করে দেয়। বাউলদের আদি সংগঠন লালন মাজার শরীফ ও সেবা সদন কমিটির তৎকালীন সভাপতি মরহুম ফকির আনোয়ার হোসেন মন্টু শাহ, সাধারণ সম্পাদক ফকির বদরশাহ্সহ কমিটির অন্যান্যদের ভয়ভীতি দেখিয়ে জেলা প্রশাসক মাজারে রক্ষিত সিন্দুকের চাবি নিয়ে নেন। লালন মাজারের অধিকার ফিরে পেতে বিভিন্ন ধরনের তৎপরতার পর ১৯৮৫ সালের ১ জানুয়ারী বাউলরা আইনের আশ্রয় নেন। কুষ্টিয়া সহকারী জজ আদালতে লালন মাজার শরীফ ও সেবা সদন কমিটির তৎকালীন সভাপতি মরহুম আনোয়ার হোসেন মন্টু শাহ লালন মাজারে তাদের স্বত্ব ও অধিকার ফিরে পেতে মামলা দায়ের করেন। মামলার রায় ডিক্রিতে আদালত উল্লেখ করেন, নালিশী সম্পত্তিতে বাদিগনের স্বত্ব, স্বার্থ দখল থাকার ঘোষণা দেওয়া গেল। আদালতের রায়ের পর মাজার বাউলদের কাছে হস্তান্তর না করে বিবাদীরা জেলা জজ আদালতে আপীল করেন। এ অবস্থায় ১৯৯৭ সালে লালন মাজার শরীফ ও সেবা সদন কমিটি নিম্ন আদালতের রায় বাস্তবায়ন করতে হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন দায়ের করে। হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখে। লালন একাডেমী তথা সরকার ২০০২ সালে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রীম কোর্টে আপীল করলে সর্ব্বোচ্চ আদালত হাইকোর্টের আদেশ বহাল রাখেন।
বিশিষ্ট লালন গবেষক প্রফেসর ড. আবুল আহসান চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, লালন মাজার বাউল সাধকদের সাধনা ও লালন সঙ্গীত চর্চার কেন্দ্র, তাদের তীর্থস্থান। ১০০ বছর ধরে বাউলরা সেখানে লালনের দর্শন ও সঙ্গীত চর্চা করে আসছে। মাজার পরিচালনার দায়িত্ব বাউলদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত। লালন মাজার পরিচালনার দায়িত্ব বাউলদের কাছে না থাকলে নষ্ট হবে বাউল সংস্কৃতি। তিনি আরও বলেন, লালন মাজারের দায়িত্ব বাউলদের হাতে না থাকায় বাউলদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে পালনে বিঘ্ন ঘটছে।
এ ব্যাপারে লালন মাজার শরীফের খাদেম ফকির মোহম্মদ আলী শাহ বলেন, আদালত রায় দিলেও এখনও পর্যন্ত বাউলদের কাছে মাজার হস্তান্তর করা হয়নি। এ বিষয়ে আমাদের অনেক ক্ষোভ রয়েছে। বাউলদের জিনিস বাউলদের রক্ষা করা উচিৎ। তবে লালন একাডেমী কর্র্তৃপক্ষ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাউলদের মতামত নিয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকেন। বর্তমান সেবা সদন কমিটি ও লালনপন্থী গুরুবাদী মানব ধর্মের অনুসারী বাউল ফকিররা বাউলদের তীর্থস্থান লালন মাজার অবিলম্বে বাউলদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান।
এল//দৈনিক দেশতথ্য //ঢাকা //
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post