মোমেছুর রহমান, কুষ্টিয়া:
কালের বিবর্তনে ও সময়ের ঘুরন্ত চাকায় পাক খেয়ে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা। গ্রামাঞ্চলের মানুষের প্রিয় লাঠি খেলা আজ বিলুপ্তির পথে। সেই খেলা এখন আর হয় না বললেই চলে। খেলার ধ্বনি আজ কাল আর শোনা যায় না। বাবরি দোলানো চুল, কঠোর হস্ত লাঠি নিয়ে ঘুরপাক খেত যে, যুবক আজ তেজহীন ক্লান্তি পথিক। যে ঢোলের বাড়ি শুনলে গাঁয়ের বধূরা ঘোমটা ফেলে ছুটে যেত, কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা লাঠি ভর করে ছুটতো গ্রামের আকুল আবেদনে। তাদের সেই উচ্ছ্বাস ও আনন্দে গ্রামের আকাশ-বাতাস মুখরিত হত। তাদের সেই উচ্ছ্বাস ও আনন্দ আজ বন্ধ হতে বসেছে। সেই ঢোল ও লাঠির বাজনা আজ আর শোনা যায় না। দল বেঁধে কোন মানুষের সেই খেলায় অংশ নিতে দেখা যায় না। তাদের সেই বাবরী দোলানো চুলও আর দেখা যায় না। লাঠিরখেলা সম্পর্কে কয়েক জন প্রবীনের মুখে জানা যায়, আজ থেকে ১৪ শত বছর পূর্বে হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) ও তার সাহাবীরা যুদ্ধে আত্মরক্ষার তাগিদে ঢাল, তলোয়ার ও লাঠি ব্যবহার করতো। যুদ্ধে যাবার পূর্বে তাদেরকে লাঠি দিয়ে বিভিন্ন রকম প্রশিক্ষণ দেয়া হত। কারো কারো মতে কারবালার সেই শিহরিত ঘটনা থেকে এই লাঠি খেলার জন্ম। আবার কারো মতে এক সময় গ্রাম-বাংলার যেসব জমিদার বাস করত সেইসব জমিদারদের আত্মরক্ষার তাগিদে তাদের লাঠিয়াল দরকার হত। কথিত আছে লাঠিয়ালদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন রকম প্রশিক্ষণ দেয়া হত। এই লাঠি খেলার জন্ম যেখান থেকেই হোক না কেন আমাদের এ দেশে প্রত্যন্ত অঞ্চলে যে খেলা এক সময় মানুষের ঘুমন্ত প্রাণকে জাগিয়ে তুলতো আজ সেই লাঠি খেলা মৃত্যুর পথে। লাঠিখেলা সাধারণত সবসময় খেলা যায় না। গ্রাম-গঞ্জে এমন অঞ্চল আছে যেখানে এ খেলা রাতে অনুষ্ঠিত হত। দিনের কর্মব্যস্ততার পর রাতে একটু আনন্দ আমেজে অংশগ্রহণ করতে শত শত মানুষ ঢাক-ঢোল পিটিয়ে কৃত্রিম আলো জেলে গভীর রাত পর্যন্ত এই খেলা চলত। কোন কোন সময় সকলের পিড়াপিড়িতে সারারাত ধরে চলত। তখন সারারাত মনে হত এক উৎসবমুখর পরিবেশ। লাঠিখেলা প্রায় ৩০ রকমের ভঙ্গিমায় খেলা যায়। এদের মধ্যে কাউন্সিল, আনন্দদায়ক, আড়গিরি ফাইট, গিরি ফাইট, বাঁশ খেলা, লাঠি ঘোরানো, সখি নৃত্য, লাঠির আড়ের গিরি ফাইট অন্যতম। এসব খেলা করতে তখনকার মানুষেরা বিভিন্ন সময় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করত। এদের মধ্যে অনেকেই নিজেদের আত্মরক্ষার তাগিদে প্রশিক্ষণ গ্রহন করত। কিন্তু আজ আর কোন লাঠি খেলার প্রশিক্ষণ দেয়া হয় না। একজন প্রবীন লাঠি খেলোয়াড়ের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, এ খেলা একসময় এতই জনপ্রিয় ছিল যে, মানুষের আনন্দ বিনোদনে কেন্দ্রবিন্দু ছিল। আজ লাঠিখেলা ভক্তদের মাঝে হতাশার ছায়া নেমেছে। তারা এই খেলাকে আবার জাগিয়ে তুলতে চাই। যে খেলা গ্রামের সুর সৃষ্টি করে, সে খেলা আবার জেগে উঠুক বাংলার প্রতিটি গ্রামে, এ খেলা বাঁচিয়ে রাখতে হবে আমাদের, নইলে হারিয়ে যাবে বাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা।
এল//দৈনিক দেশতথ্য //ঢাকা //
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post