আল-হেলাল :
“শিক্ষার গুণে শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী হয়ে গেছে অনেকজন
শিক্ষার গুণে ভূমন্ডলে ধণ্য হয় মানবজীবন\
মাতৃশিক্ষা না হইলে সেই শিক্ষাতে ভুল থাকিলে
তারে কি আর মানুষ বলে ভাবিয়া দেখরে মন।
মাতৃশিক্ষা যাহার আছে সেই মানুষ বনে গেছে
গণ্য সে মানুষের কাছে সে হইলো মানুষ রতন\
দুধে সত্য মাখন থাকে কেউনা তারে চোখে দেখে
পুরান দুধে মন্ত্রনের ফাঁকে ভেসে উঠেনা মাখন।
নতুন দুধে পাতরে দই মাখন মিলবে শুন তোরে কই
মন্ত্রনে পাকাইলে সে দই ভোগ করিবে আশ্বাদন\
চিন রাশিয়া বিলাত জাপান শিক্ষার জন্য তারাই প্রধান
এর উর্ধ্বে বাঙ্গালির জ্ঞান ইসলামকে করছে গ্রহন।
দেখ কোরআন আল্লাহর মুখের বাণি অনেক আছেন হাফেজ জ্ঞানী
শুনিলে কোরআনের ধ্বনি জুরায়রে মানুষের মন\
বৃথা দিন গেলাম কাটিয়া মোহমায়ায় মজিয়া
না চিনলাম নবী আউলিয়া বসে ভাবি সর্বক্ষণ।
ওরে মুখে শুধু করলাম দাবি না চিনিলাম প্রিয় নবী
ভাবিয়া কয় কামাল কবি হকপথে মজাওরে মন” \
সাধারণ অর্থে জ্ঞান, দক্ষতা ও মূল্যবোধ অর্জন এবং মানুষের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনার পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনই হলো শিক্ষা। বাংলা ‘শিক্ষা’ শব্দটি এসেছে ‘শিক্ষ’ ধাতু থেকে, যার অর্থ বিদ্যাগ্রহণ বা শেখা।
অন্যদিকে শিক্ষার ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘Education’ এসেছে ল্যাটিন শব্দ ‘Educare’ বা ‘Educatum’ থেকে, যার অর্থ ভেতর থেকে কিছু বের করে আনা বা বিকশিত করা। শিক্ষা মূলত চার ভাগে বিভক্ত। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট নিয়ম ও কাঠামোর মধ্যে যে শিক্ষা অর্জন করা হয় তাকে বলা হয় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা (Formal Education)। কাঠামোগত হলেও যা আনুষ্ঠানিক বিদ্যালয় ব্যবস্থার বাইরে পরিচালিত হয় তাহলো প্রাতিষ্ঠানিক বহির্ভূত শিক্ষা (Non-formal Education)। প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা,পরিবেশ ও সমাজের সংস্পর্শে মানুষ যা নিজে থেকেই শেখে তাকে বলে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা (Informal Education)। আর পারিবারিক মন্ডলে মাতাপিতার কাছ থেকে যে শিক্ষা লাভ করা হয় তাকে বলে মাতৃশিক্ষা।
সক্রেটিস বলেছেন “শিক্ষা হলো মিথ্যার অপনোদন ও সত্যের বিকাশ।” এ্যারিস্টটল বলেন “সুস্থ দেহে সুস্থ মন তৈরি করাই হলো শিক্ষা।” রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে “শিক্ষা হলো তাই, যা আমাদের কেবল তথ্য পরিবেশনই করে না; বিশ্বসত্তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের জীবনকেও গড়ে তোলে।”
সাক্ষরতা হলো কোনো একটি ভাষায় পড়তে,লিখতে এবং ছোটখাটো তথ্য বুঝতে পারার মৌলিক সক্ষমতা
সাক্ষরতা (বা সাক্ষর) শব্দের অর্থ অক্ষরজ্ঞান বা শিক্ষা। যিনি পড়তে ও লিখতে পারেন, তিনি সাক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন।
আবার স্বাক্ষর এর অর্থ নিজের নাম বা দস্তখত (Signature) দিয়ে কোনো কিছুতে সম্মতি জানানো বা সই করা। সাধারণ ভাষায় বানান বা প্রত্যয়গত কারণে ‘স্বাক্ষরতা’ শব্দটি লেখা হলেও আভিধানিক ও শুদ্ধ রূপ হলো ‘সাক্ষরতা’।
সংজ্ঞা নিরুপন করতে গিয়ে জাতিসঙ্গের ইউনেস্কো বলেছে, যে ব্যক্তি দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে সহজ বিবরণ পড়ে বুঝতে ও লিখতে পারেন, তিনিই সাক্ষর। কিন্তু কেবল নাম সই করা বা সাধারণ অক্ষরজ্ঞান নয়, বরং আধুনিক যুগে জীবনমুখী দক্ষতা ও তথ্য অনুধাবনের ক্ষমতাকে কার্যকরী স্বাক্ষরতা বলা হয়। ৮ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। এই দিবসটিকে সামনে রেখে সুনামগঞ্জের সকল শিক্ষানুরাগীরা একজন বিশেষ মরমী সাধকের কথা পরম শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় স্মরণ করে থাকেন। আর তিনি হচ্ছেন জেলার ৫ প্রধান লোককবির মধ্যমনি গানের সম্রাট বাউল কামাল পাশা (কামাল উদ্দিন)। যিনি তার গানে বলেছেন,শিক্ষাগুরু শ্রীকৃষ্ণ দীক্ষাগুরু শ্রীরাধিকা। ভক্তির ৬৪ অঙ্গ শাস্ত্রেতে পাইলাম লিখা। আরো গেয়েছেন,শিক্ষার গুনে শ্রেষ্ট জ্ঞানী হয়ে গেছে অনেকজন। শিক্ষার গুনে ভূমন্ডলে ধন্য হয় মানবজীবন। মাতৃশিক্ষা না হইলে সেই শিক্ষাতে ভূল থাকিলে তারে কি আর মানুষ বলে ভাবিয়া দেখরে মন। মাতৃশিক্ষা যাহার আছে সেই মানুষ বনে গেছে গণ্য সে মানুষের কাছে,সে হয়রে পরশ রতন”।
মানুষ পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য স্বাক্ষরতা এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সারা দেশের ন্যায় সুনামগঞ্জে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালিত হয়েছে।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় দিবসটি পালন উপলক্ষ্যে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। জেলা প্রশাসন ও জেলা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন, জেলা প্রশাসক ও বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) শাকিলা রহমান এর সভাপতিত্বে ও উপস্থাপনায় সভায় অন্যান্যর মধ্যে বক্তব্য রাখেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) রাকিবুল হাসান রাসেল,জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য এডভোকেট শেরেনুর আলী,জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোহনলাল দাস, পিটিআই এর সুপারিনটেনডেন্ট দীপংকর মোহান্ত,জেলা শিক্ষা অফিসার মো: জুলফিকার হোসেন,জেলা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যুরোর সহকারী পরিচালক শামীম আহমেদ,জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি হারুন রশীদ ও শিক্ষক নেতা মোঃ তগুর আলীসহ সংশ্লিষ্ট সকল শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তাবৃন্দ। পরে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষ্যে শহরে একটি র্যালী প্রদর্শন করা হয়।
উল্লেখ্য ১৯৬৬ সালের ৮ ই সেপ্টেম্বর থেকে ইউনেস্কো কর্তৃক এই দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় পালন করা হয়। এর আলোকে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক কর্তৃক র্যালী ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। জেলা সদরের ন্যায় ১২টি উপজেলা সদরেও অনুরুপভাবে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালিত হয়েছে। দিবসটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করা উচিত এজন্য যে,ভাটির জনপদ সুনামগঞ্জ জেলা আজো শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। অথচ এই জনপদকে শিক্ষাদীক্ষায় এগিয়ে নিতে বাউল কামাল পাশার মত মরমী সাধকরাও কমবেশী ভূমিকা পালন করেছেন। এজন্য এই দিবসটিতে আমি শ্রদ্ধার সাথে এই মহান মরমী সাধকের অবদানকে স্মরণ করি।
শিক্ষা শব্দটির শাব্দিক অর্থে বিভিন্নতা থাকলেও জানাকে মানায় পরিণত করার মন মানসিকতাকেই শিক্ষা বলে। এই শিক্ষা শব্দটির দ্বারা কোন কিছু শিক্ষা করা,অভ্যাস করা,চর্চা করা ,বিদ্যা,কৌশল,দক্ষতা,এলেম,জ্ঞান লাভ করা,ভদ্রতা শেখা,গভীর মনোযোগের সহিত অধ্যয়ন,দায়ে পড়ে শেখাসহ বিভিন্ন পন্থাকে বুঝায়। যারা এই মহাণ কাজটির দায়িত্বে ন্যস্ত থাকেন তারাই হচ্ছেন শিক্ষক। এই শিক্ষক শব্দটিও নানান জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন গুরু ,ধর্মোপদেষ্ঠা,শিক্ষাদাতা,দীক্ষাদাতা,ওস্তাদ,মন্ত্রদাতা,মাওলানা,আচার্য্য,উপদেশক,গুরুজন ও পূজনীয় ব্যক্তিত্ব। আমাদের মরমী সংস্কৃতিতে শিক্ষাদানকারীকে কখনও গুরু,কখনও মুরশিদ আবার কখনও ওস্তাদ হিসেবে বিবৃত করা হয়েছে। যিনি সঙ্গীত জগতের সকল শাখা প্রশাখায় অবাদে বিচরন করে এই শব্দগুলোর মাধ্যমে নানা কাহিনী ও গীত রচনা করতঃ অসম্ভব পান্ডিত্যের স্বাক্ষর রেখে কালের ইতিহাসে কিংবদন্তী হয়ে আছেন তিনি হচ্ছেন গানের সম্রাট কামাল পাশা। যিনি সুনামগঞ্জের পঞ্চরতœ বাউল যথাক্রমে বৈষ্ণব কবি রাধারমন দত্ত,মরমী কবি হাছনরাজা,গানের সম্রাট বাউল কামাল পাশা (কামাল উদ্দিন),বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম ও জ্ঞানসাগর দূর্বিণ শাহ এই ৫ প্রধান লোককবির মধ্যমণি। তিনি ১৯০১ ইং সনের ৬ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া গ্রামে তালুকদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা সাধক পুরুষ মরমী কবি আজিম উদ্দিন ডাক নাম টিয়ার বাপ। মায়ের নাম আমেনা খাতুন (ঠান্ডার মা)। ২ পুত্র ও ৩ কন্যার মধ্যে পরিবারের জেষ্ট সন্তান ছিলেন বাউল কামাল পাশা। গ্রামের সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন শেষে একই গ্রামের স্থানীয় হাইস্কুলে ভর্তি হতে চাইলে তৎকালীন জমিদার পরিবারবর্গের দ্বারা পরিচালিত ঐ শিক্ষা প্রতিষ্টানটিতে অন্যান্য সাধারন পরিবারের শিক্ষার্থীদের ন্যায় কামাল পাশাকেও ভর্তি হতে দেয়া হয়নি। পরে তিনি রাজানগর কৃষ্ণচন্দ্র পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এমই,সুনামগঞ্জ জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং সিলেটের এমসি কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন। ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসায় হাদিস শাস্ত্রের উপর লেখাপড়া করেন। সদিচ্ছা থাকা সত্তে¡ও তিনি এমএ পর্যন্ত লেখাপড়া করতে পারেননি। এ হতাশার কথাটি তিনি স্বরচিত একটি আঞ্চলিক গানে প্রকাশ করে গিয়েছেন,“বলো মোদের সিলেটবাসীর কিসের ভয়/যে জায়গাতে জালাল বাবা শুইয়ে আছেন সব সময়।। আদা হলদি পিয়াজ রসুন ঐ সিলেটে সব আছে/ স্কুল কলেজ মাদ্রাসা ভাই জায়গায় জায়গায় বসেছে/এ কামাল কয় দুঃখের বিষয় এম,এ পড়ার সুযোগ নয়”।।
কবিয়াল কামাল, বাউল কামাল উদ্দিন, কামাল পাশা ও কামাল উদ্দিন সরকার ইত্যাদি অনেক নামে সংস্কৃতির অঙ্গন টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া সুন্দরবন থেকে সুনামগঞ্জ ছাড়াও প্রতিবেশী দেশ ভারত পাকিস্তানে তাঁর ব্যাপক পরিচিতি ছিল এবং যার গান শুনা যেতো গ্রামোফোন রেকর্ডে (কলের গান)। সংগীতের সাধনার পাশাপাশি তিনি ১৯৩৫ সালে জমিদারদের আগ্রাসন এর প্রতিবাদে বৃটিশদের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক নানকার আন্দোলন, ৪৭-এ রেফারেন্ডাম, ৫২-র ভাষা আন্দোলন, ৫৪-র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের পক্ষে গণসঙ্গীত পরিবেশন, ৭০-এর সাধারণ নির্বাচনের পূর্বে আজমেরীগঞ্জ, শাল্লা, দিরাই, জামালগঞ্জ ও মোহনগঞ্জে উপজেলা সদর সহ বেশ কয়েকটি নির্বাচনী জনসভায় স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের পক্ষে নির্বাচনী সঙ্গীত এবং ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে টেকেরঘাট সাবসেক্টরের অধীনস্থ মুক্তিফৌজের ক্যাম্পে গণসংগীতসহ জাগরনী গান পরিবেশন করে অমর হয়ে আছেন।
৫৪-র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে দিরাই, শাল্লা, জগন্নাথপুর আসনে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলহাজ্ব আব্দুস সামাদ আজাদ এর বিজয়কে সুনিশ্চিত করতে বিভিন্ন নির্বাচনী জনসভায় বাউল কামাল উদ্দিন পরিবেশিত-দেশে আইলো নতুন পানি ঘুছে গেল পেরেশানী/মাছের বাড়লো আমদানী দু:খ নাইরে আর শিরোনামে ৫৪ লাইনের একটি দেশাত্ববোধক গান পাকিস্তানের মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত গড়ে তুলে।
বিপ্লবি কামালের নানকার আন্দোলন সম্পর্কে জানা যায়, বৃটিশ আমলে বাঘ ও বন্যপশুর দখলমুক্ত করে জঙ্গল রকম ভূমি আবাদ করা স্বত্বেও নানকার শ্রেণীর কৃষকদেরকে বঞ্চিত করে সরকার জমিদারদের অনুকুলে ভূমি মালিকানা হস্তান্তর করে। তালুকদার ও মিরাশদার এর ন্যায় নানকাররাও যাতে ভূমি মালিক হিসেবে তাদের মানবিক দাবীকে প্রতিষ্টিত করতে পারে সে লক্ষ্যে ১৯৩৫ সালে কামাল উদ্দিন জমিদারদের আগ্রাসন এর বিরুদ্ধে নানকার বিদ্রোহ শুরু করেন। নিজ গ্রাম ভাটিপাড়া, রফিনগর ইউনিয়ন , দিরাই শাল্লা নির্বাচনী এলাকা থেকে শুরু করে তার এ প্রজাবিদ্রোহ সমগ্র পূর্ববঙ্গে দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে। তৎকালীন কংগ্রেস নেতা করুনাসিন্ধু রায় ও কৃষক নেতা লালা সরবিন্দু দে বুলি বাবু সহ অনেক নেতারা কামাল উদ্দিনের স্থানীয় এ আন্দোলনকে মডেল ধরে এটিকে জাতীয় ইস্যুতে পরিণত করেন। ফলশ্রতিতে ১৯৩৭ সালে আসাম প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে সাবেক সাংসদ কমরেড প্রসুণ কান্তি রায় বরুন রায় এর পিতা কংগ্রেস নেতা করুনাসিন্ধু রায় এমএলএ নির্বাচিত হন এবং ১৯৪১ সালে আসাম পার্লামেন্টে প্রজাতন্ত্র আইন পাশ হয়। সামন্তবাদের বিরুদ্ধে আজীবন বিদ্রোহী কামাল উদ্দিন স্বদেশ আন্দোলন, গণভোট ও ভাষা আন্দোলনেও অংশ নেন। ১৯৪৭ সালের গনভোট চলাকালে দিরাই শাল্লায় সর্বত্র ছিল নির্বাচনের আমেজ। দু উপজেলার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হিন্দু ধর্মাবলম্বী ভোটাররা স্বতস্ফুর্তভাবে পাকিস্তানের পক্ষে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। ফলশ্রæতিতে অক্ষয় কুমার দাস পাকিস্তানের সবকটি সরকারের আমলে একাধিকবার মন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হন।
সঙ্গীত জীবনের প্রত্যেক পরতে পরতে সাধনা করতে গিয়ে উস্তাদকে প্রতিটি ধাপে স্মরণ করে গান গেয়েছেন এই বাউল কবি। তিনি কখনও স্বয়ং স্রষ্টাকে শিক্ষক হিসেবে উপলব্ধি করে গান গেয়েছেন। জীবনের প্রথম গানে তিনি উল্লে¬খ করেছেন, ওস্তাদ গুরু মাতা আর পিতা/তাদের পদে বারে বারে নোয়াইগো মাথা। ঋন শোধিবার নাই ক্ষমতা/মনে ভেবে দেখিলাম।। বিসমিল্লাহ বলিয়া মুখের জবান খুলিলাম/যে বিসমিল্লাহর হয়না ওজন পৃথিবী দিলে তামাম।। যতদুর সম্ভব শুদ্ধরুপে ইলম বা জ্ঞান অর্জনের উপর গুরুত্বারোপ করে তিনি গেয়েছেন,ইলম আমল বংশগত,হইতে হবে ছহিমতো/নইলে কেন পাগল সাজতো/ছেড়ে বাদশাহ সোনারপুরী/বেশ ধরিলে হয়না ফকিরী”।। মারিফতের জ্ঞান অর্জনের তাগিদ দিয়ে তিনি গেয়েছেন, মাদ্রাসাতে টাইটেল দিলে খাটি ওয়াজী মুসলমান/সকল বিদ্যায় পন্ডিত মশাই বাংলাতে রাখো ধ্যান/রাখোনিরে তাহার সন্ধান কোন দেশে কিবা হায়/সে মানুষের দেশে গেলে আয়রে তোরা আয়রে আয়/মরা হইয়া যে মানুষে জিন্দার সনে হাত মিলায়”।। বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী নিউটন বলেছেন জ্ঞান সমুদ্রের বালুকা বেলায় দাড়িয়ে শুধু বালুকণা নিয়ে নড়াচড়া করছি কিন্তু অনন্ত সমুদ্রের সাক্ষাৎ আজো পাইনি। নিউটন হতাশার কথা বললেও ইতিবাচক আশার কথা বলেছেন বাউল কামাল পাশা। তিনি গেয়েছেন,আছে মানুষ অতি নিকটে নয়সে পলাইয়া/জ্ঞান সাগরে ডুব দিয়া দেখো জ্ঞানের বাত্তি জ্বালাইয়া। শিক্ষাঙ্গনে অধ্যয়ন করতে আসা এক শ্রেনীর সন্ত্রাসীদের কর্মকান্ড সম্পর্কে তিনি বলেছেন, “রাস্তায় ঘাটে দেখা যায়,বাংলার নেতা ঘরে ঘরে/ভাবলে মাথা ঘুরে এসব ভাবলে মাথা ঘুরে।। জ্ঞান শিখিবার তরে যারা স্কুল কলেজে পড়ে/একটুখানি স্বার্থের জন্য রাস্তায় ঘাটে মানুষ মারে”।। শিক্ষকের কথাকে সত্য হিসেবে গ্রহনের জন্য তিনি উল্লেখ করেন“গুরুর বাক্য করে লক্ষ্য চলেছে যেজন/চার চন্দ্র অনায়াসে তার হইয়াছে দরশন/করেছে যেজন,সাধন করেছে যেজন”।। স্রষ্টাকে গুরুজী হিসেবে প্রশ্ন করে তার কন্ঠে ধ্বনীতো হয়েছে,ওগো দয়াল গুরুজী/সকলকে তড়াইলায় ভবে আমার উপায় কি? তিনি অজ্ঞানতাকে মূর্খতা হিসেবে গণ্য করে বর্তমান ঘুণেধরা সমাজকে তিরস্কৃত করেছেন এই বলে,“এ ভবেতে যে মানুষ অজ্ঞান/সোনারুপা নাই ব্যবধান তার কাছে সমান/কামাল বলে কলির যুগে চলছে এই নমুনা/অজ্ঞানেকি চিনতে পারে আকবরী সোনা”।। অভিজ্ঞতার দ্ধারা তিনি তার জীবনের বিপদতরীকে তীরে ভিড়াতে চান। এজন্য একটি আজীজি গানে কবি গেয়েছেন, “মুর্শিদও জ্ঞান মস্তুুলের জ্ঞানের বলে প্রেমের সুতায় বাদাম তুলে/যাইব চলে টেউয়ের মাঝে মাঝে/কাল কুম্ভিরের ভয় না লাগে দুরে থাকবো লাজে।। মূর্শিদও টেকিয়াছি দুই কুলের মাঝে”।। পুথিগত বিদ্যা অর্জন করলেই মানুষ প্রকৃত জ্ঞানী হয়না। সচেতনতা হচ্ছে জ্ঞানী লোকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাই অসচেতন পরাধীন মানুষকে স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্রে উজ্জীবিত করতে উদাত্ত¡ আহবাণ জানিয়ে কবি পরিবেশন করেন,“জ্ঞানী মানুষ অজ্ঞান হইয়া যে দেশেতে দিন কাটায়/এমন একটা দেশে থাকার কোন মানুষের মনে চায়”। মানব জাতিকে শুধু শিক্ষিত হলেই চলবেনা। তার মধ্যে থাকতে হবে আদর্শ চরিত্র। এবং শৈশব কাল থেকেই সন্তান সন্ততিদেরকে দিতে হবে নৈতিক শিক্ষা। এ প্রয়োজনকে উপলব্ধি করে কবি গেয়েছেন,“ছেলেমেয়ে যাদের আছে দিয়ে একটু মনোভাব/ভালো করে গড়ে নাও চরিত্র স্বভাব/বাউল কামাল পাশা আমি বলতেছি এখন/গুরুর কাছে শিক্ষা নিও চলাফেরার নিয়ম কানন/নলের চাটিত ঘুমাইয়া এখন দেখছো লক্ষ টাকার খাব”।। নারীদেরকে স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার আহবানও রয়েছে এই শিল্পীর গানে। “স্বামী ভজন শিক্ষা করো গিয়া ওলো মাইয়া/স্বামী ভজন শিক্ষা করো গিয়া”। শিক্ষককে মুরশিদরুপে গণ্য করে কবি তার মারফতি গানে গেয়েছেন,“ও মন শিখিবায় যদি/মুরশিদের বাজারে আছে আবসুরা নদী।।ও মনরে আবসুরা নদীতে যদি নাও বাইতে হয়/মুরশিদের কাছে শিখো নদীর পরিচয়। নদীতে নোনা পানি আসিবে যখন/ডুব দিলে সেই জ্বলে হারাইবায় জীবন”।। জ্ঞান অর্জনকে মানুষের ভূষন বর্ণনায় কবি লিখেছেন, “জ্ঞানী হইলো মানুষ রতন,জ্ঞানে পাওয়া যায় সাঁই নিরাঞ্জন/এ কামাল কয় ও পাষাণ মন ঘুচাইলেনা অন্ধকার/মানুষ যারা জানে তারা মানুষের কি ব্যবহার/ভালো মন্দের হয় পরিচয় করিলে আচার বিচার”। বাউল কামাল পাশা মৎস্য প্রজাতিকে রুপক অর্থে ব্যবহার করে গান রচনার মাধ্যমে পাকিস্তান আমলের দুঃশাসনের প্রতিবাদ জানিয়ে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে প্রচারনা চালাতে গিয়েও শিক্ষা কথাটিকে ভূলে যাননি। এরকম একটি দেশাত্ববোধক গানে তিনি গেয়েছেন, “দেশে আইলো নতুন পানি ঘুচে গেল পেরেশানী/মাছের বাড়লো আমদানী দুঃখ নাইরে আর।। মাছের শিকারী যারা সংকটে পড়েছে তারা/গেলে কেউ মাছ ধরা হয়রে গ্রেফতার/ছোট বড় যত মাছ শিক্ষা করলো আইনের কাজ/জেলা থানা মহকুমা তাদের অধিকার।। শিক্ষা মন্ত্রী হইলো বাচা সাক্ষী সত্য নয়রে মিছা/স্কুল কলেজ মাদ্রাসা ইন্সপেকসনের ভার/কই যদিগো আসল কথা কয়েকটার ঘুরাইবে মাথা/কামাল পাশার পলোর জাতা থাইকো হুশিয়ার”।
অনুসন্ধানী মন শিক্ষা গ্রহনের আরেকটি মাধ্যম। তাই সকল ধরনের জ্ঞানকে অনুসন্ধানের তাগিদ দিয়ে কবি গেয়েছেন,ও মন খুজ মারিফত/শরীয়ত বিচার করিলেই মিলবে মারিফত/তরিকতের নিশান ধরো আয় করে লও হকিকত”।।
এমনিভাবে কামতত্ত¡রকম একাধিক গানেও তিনি শিক্ষা শব্দটি প্রয়োগ করেছেন। গেয়েছেন,“ট্রেনিং মাস্টার খুজে নিয়া শিখ রুল রেগুলেশন/কামিনীর ম্যাচক্যালাতে উনিয়ার যদি হবে মন”।। শুধুমাত্র পবিত্র ধর্ম ইসলামের মর্মবাণী দিয়েই নয় বরং সনাতন ধর্মের অনেক অজানা কথা দিয়ে গীত রচনা করতে গিয়েও তিনি শিক্ষা শব্দটি বিবৃত করেছেন এভাবে।“জানতামনা প্রেম ছিলাম আন্ধা,প্রেম শিখাইলো মোরে বৃন্দা/ভূলাইলো মতি/ওরে কোনবা নারী হইয়া বৈরী,নিভাইলো ঘরের বাতি।। গেল কূলও জাতি/কালার সনে মন মজাইয়া গেল কূলও জাতি”।। বাউলের এসব গান থেকে জানা যায়,মথুরার নিকটবর্তী শহর বৃন্দাবন নামক স্থানটি ছিল রাধাকৃষ্ণের লীলাভূমি। যমুনাতীরস্থ গোকুল গ্রামে শ্রীকৃষ্ণ ও বলরাম নন্দালয়ে পালিত হয়েছিলেন। জন্ম নিয়েছিলেন দৈবকীর গর্ভে। অন্যদিকে বৃষভানু গোপের কন্যা ও আয়ান ঘোষের স্ত্রী হচ্ছেন শ্রীরাধিকা। যিনি কৃষ্ণপ্রেমে সর্বত্যাগীনী হয়েছিলেন। একদিকে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি সুগভীর আসক্তি অন্যদিকে সতীত্বধর্ম ও বংশ মর্যাদা এই দুটানার মধ্যে পড়ে শ্রীরাধিকা হয়েছিলেন মানসিক দ্বন্দ্বের সম্মুখীন। শ্রী রাধিকা কৈশোরে প্রেম কি জিনিস জানতেননা। সখী বান্দবীদের মধ্যে সর্বপ্রথম দূতিয়ালী বৃন্দা নাম্নী নারীই তাকে কৃষ্ণপ্রেমে বিভোর করেন। তাই বৃন্দাকে দোষারুপ করে শ্রীরাধিকার যে ক্ষোভ ও অভিযোগ মূলত সেগুলোকে নিয়েই কবি রচনা করেছেন এরকম অসংখ্য প্রেমতত্ত¡ বিচ্ছেদী ধামাইল ও গুষ্টতত্ত¡ গান। অনুরুপ আরেকটি বিচ্ছেদী গানে কবি গেয়েছেন,“দিয়া মোরে কত আশা,শিখাইলায় ভালবাসা,প্রতিজ্ঞা বন্ধনে/ভূলে গেলায় সেই প্রতিজ্ঞা,একদিন কি পড়েনা মনে।। তুমি ভূলিলায় কেমনে/এত মায়া করেরে বন্ধু ভূলিলায় কেমনে”।। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অপর নাম কালা। প্রেমিক কৃষ্ণকে উদ্দেশ্য করে শ্রীরাধিকার আকুতিকে বিচিত্র সূরের মূর্ছনায় উপস্থাপন করে কবি গেয়েছেন,শিখাইয়া বুঝাইয়ারে কালা বাড়াইলে পিরীতি/কল কৌশলে করে গেলে আমার ঘর ডাকাতি। কালা তোর সনেরে/কালা তোর সনেরে আমি প্রেম করিয়া/মান কূলমান গেল আমার এভবে চলিয়া”।। শ্রীকৃষ্ণের আরেক নাম শ্যামকালিয়া। যার নামের প্রেমে শ্রীরাধিকা পাগল প্রায়। যার আহাজারীকে কবি তার ধামাইল গানে উপস্থাপন করেছেন।“ আশা দিয়া প্রেম শিখাইলো বন্ধু গুনমনী/এগো আমারে বানাইলো যেমন বনপুড়া হরিনী। শ্যাম কালিয়ার প্রেমে পড়ে হইলাম কলঙ্কিনী”।। কাঙ্কিত কৃষ্ণের নামে প্রেমে বিভোর হলেও শ্রীরাধিকা তার সান্নিধ্য পাননি। তাই কখনও কৃষ্ণপ্রেমকে মিছাপ্রেম বলেই মনে করতেন সেই অভিমানিনী। ব্যর্থ প্রেমের এ আহাজারীকেও কবি তুলে ধরতে ভূল করেননি। আগেতো জানিনা আমি প্রেম শিখাইয়া যাইবায় তুমি/আমি কাঁদি বসে নির্জনে।। মিছাপ্রেম করলামগো কালার সনে/আমি না জানিয়া ভূবনে”।। এরকম আরো গেয়েছেন,কোকিল কালো বন্ধু কালো,কালো মাতার কেশ/কালো রুপে পাগল করলো দেশ।। শিখাইয়া বুঝাইয়া বন্ধে ঠেকাইলো তার প্রেমওফান্দেরে/বন্ধের লাগি কেন্দে কেন্দে জীবন হইলো শেষ।। প্রেম শিখাইয়া শ্যাম কালিয়া কিদোষে গেল ছাড়িয়ারে/শ্যামকালিয়া সোনাবন্ধে লইলোনা উদ্দেশ”।।
শিক্ষার কোন শেষ নাই। সৃষ্টির আদি হইতে অন্ত পর্যন্ত সর্বত্রই শিক্ষার গুরুত্ব আছে এবং থাকবে। সৃষ্টির প্রথম মানব হযরত আদমকে ফেরেস্তা জীব্রাইলের মাধ্যমে শিক্ষাদান করান স্বয়ং আল্লাহতায়ালা। বাউল কামাল পাশার পন্ডিত পিতা মরমী কবি আজিম উদ্দিন এসত্যটি তুলে ধরে গেয়েছেন,“কাজ করিলে মান যাবে তোর কোন হাদিসে পাইলে/রে ভাই মুসলমানের ছেলে ও ভাইরে ভাই মাখারু মাখারিন আল্লাহ বলেছেন ক্বোরআনে/মক্কর বুঝিতে সাধ্য নাহি কার ভূবণে/আদমকে প্রথম কাজ শিখান জিব্রাইলে/আজিম বলে বিশ্বাস না হয় দেইখো হাদিস খূলে”।। এক সময় পৃথিবীতে জ্ঞান অর্জনের জন্য কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব ছিলনা। সভ্যতার সুচনালগ্নে গুরুগৃহকে কেন্দ্র করেই শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালিতো হতো। কিন্তু বর্তমান বাউল সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কোন মাধ্যম ছাড়াই স্বঘোষিত বাউল বনে যান। এসব স্বঘোষিত বাউলদেরকে উদ্দেশ্য করে বাউল কামাল পাশা একটি আঞ্চলিক গানে গেয়েছেন,“শুনরে বেঘরা,চেতন গুরুর সঙ্গ নিয়া শিখ বাউলারী ধারা/চেতন গুরুর সঙ্গ ছাড়া,ভবে সুনাম হয়নারে ধন্য। ৩ দিনের ছাগী অইয়্যা ভাতরে কছ অন্ন। ও তোর স্বভাবে ধরা পড়েছে নাইরে তোর গুরু মান্য”।। গান শিখা ও গান শুনার প্রতি গুরুত্বারোপ করে কবি গেয়েছেন,“ও গান গাইলে কি আর হবেরে গানের অর্থ না বুঝিলে/গানের অর্থ না বুঝিলে গান গাওয়া বিফলেরে।। গান গায় দেশের জ্ঞানী গুনী গান গায়না পাগলে/গানের অর্থ যারা বুঝে ভাসে নয়ান জ্বলেরে।।গান শুনিলে আশিক যারা ৬ লতিফা খুলে/৬ লতিফায় জিকির উঠে কোন জিকির কে বলেরে।। গান হইলো আশিকের খোরাক এলমে ফ্যাকায় বলে/গান গাওয়া নয় কালাম পড়া কয় কবি কামালেরে”।।
উল্লেখ, সুনামগঞ্জ কলেজের আঙ্গিনায় এই মহাণ সংগীত সাধক তাঁর সাধনা জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিবাহিত করে গেছেন। ১৯৬৭ সালে নির্বাচিত সুনামগঞ্জ কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি সাংবাদিক রাজনীতিবিদ বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম রব্বানী ও জিএস সাবেক এমপি নাছির উদ্দিন চৌধুরী বলেছেন,স্বাধীনতা লাভের পূর্ববর্তী সময়ে বৃহত্তর সিলেট জেলায় বাউল কামাল উদ্দিনই ছিলেন একমাত্র অপ্রতিদ্বন্দ্বী বাউল শিল্পী যাকে পালাগানে কেউ হারাতে পারেনি। আমরা কলেজে ছাত্র সংসদের বেশ কয়েকটি প্রোগ্রামে তাকে অতিথি শিল্পী হিসেবে দাওয়াত করে আনতাম। তিনি মুসলিম ছাত্রাবাসে অবস্থান করে কলেজের প্রত্যেকটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি শহরের বিভিন্ন গ্রামে ওরস অনুষ্ঠানে গান গাইতেন। কলেজের সাবেক ছাত্র কমনওয়েলথ জার্নালিজম এসোসিয়েশনের সভাপতি হাসান শাহরিয়ার ভাটিপাড়া গ্রামের কৃতিসন্তানদের মধ্যে বাউল কামাল পাশার নাম উল্লেখ করে বলেছেন,১৯৬৩ সালে হাছন রাজা লোক উৎসবে বাউল কামাল উদ্দিন পালাগানে শ্রেষ্ট শিল্পী নির্বাচিত হয়ে গানের সম্রাট উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। বিশিষ্ট সাংবাদিক কলামিস্ট এডভোকেট হোসেন তওফিক চৌধুরী লিখেছেন,বাউল কামাল পাশার অবদান নিয়ে আরো গবেষণা হওয়ার দরকার। জেলা জাসদ সভাপতি আতম সালেহ বলে গেছেন,তিনি হাছননগর এলাকায় প্রোগ্রামে সবসময় আসতেন। একবার বাজানো শিখতে গিয়ে তাঁর বেহালার তার আমি ছিড়ে ফেলি। বাউল তছকীর আলী বলেন,আমি বাজারে আসা যাওয়ার পথে মুসলিম ছাত্রাবাসে তাঁকে দেখতাম ইংরেজী পত্রিকা গভীর মনোযোগ সহকারে পড়তে। কলেজের সাবেক ছাত্রদের মধ্যে সিনিওর আইনজীবি এডভোকেট হুমায়ুন মঞ্জুর চৌধুরী,দেওয়ান ইছকন্দর রাজা চৌধুরী সুবক্ত রাজা,এডভোকেট শহীদুজ্জামান চৌধুরী,এডভোকেট আব্দুল ফাতির চৌধুরী শিরিন,অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ শিক্ষক লোকমান হোসেনসহ আরো অনেকেই আজো বাউল কামাল পাশার সুর মুর্ছনার কথা স্মৃতিচারন করেন।
জীবদ্ধশায় সাধনার আরাধনার ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ সালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সিলেট শুভাগমন উপলক্ষ্যে প্রদত্ত সংবর্ধনা সভায় সংগীত পরিবেশন, ১৯৬৪ সালের ১৮-২৪ ফেব্রæয়ারী সুনামগঞ্জ জুবীলি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে সপ্তাহব্যাপী সাহিত্য ও সংস্কৃতি উৎসবে আয়োজক কমিটির সভাপতি তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক এম.এ মোত্তালিব ও আটর্স কাউন্সিল সেক্রেটারী সাংবাদিক আব্দুল হাই সাহেবের আমন্ত্রনে সাড়াদিয়ে (মালজোরা) পালাগান পরিবেশন করে শ্রেষ্ঠ বাউল শিল্পীর পদক লাভ করেন তিনি। মহকুমা প্রশাসন আয়োজিত উৎসবের প্রত্যক্ষদর্শী গীতিকার, নাট্যকার দেওয়ান মহসিন রাজা চৌধুরী বলেন, অনুষ্ঠানের অপ্রতিদ্বন্দী বাউল শিল্পী মনমোহীনি সরকার পালাগানে বাউল কামাল পাশার কাছে পরাজিত হয়ে তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। ঐ অনুষ্ঠানেই ঢাকা থেকে আগত অতিথি শিল্পী আব্দুল আলিম বাউল কামাল পাশার গানের তারিফ করে নিজেকে কামাল পাশার ভাবশিষ্য বলে ঘোষনা দেন। প্রেমের মরা জলে ডুবেনাগো দরদী,পারঘাটাতে আমায় করো পার দীনবন্ধুরে,চোরায় করলো ডাকাতি, নদীর স্রোতে নিঝুম রাতে কে যাও তরী বাইয়া, ভাটিয়াল পানে কে যাও বাইয়ারে ঘাটে ভিড়াও নাও,আমি চাইনা দুনিয়ার জমিদারী কঠিন বন্ধুরে/চাইনা দুনিয়ার জমিদারীসহ বেশ কয়েকটি কামালগীতি রেডিও টেলিভিশনে পরিবেশন করেন শিল্পী আব্দুল আলিম। মহকুমা প্রশাসন কর্তৃক তাঁকে গানের সম্রাট উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ১৯৯৬ সালে ২৬ মার্চ প্রকাশিত “ সিলেট বিভাগের পাঁচশ মরমী কবি” গ্রন্থের ৮০নং পৃষ্ঠায় লেখক, গবেষক মোঃ সিদ্দিকুর রহমান উল্লেখ করেন “ বাউল কবি দুর্বীন শাহ, কামাল উদ্দিনকে শ্রদ্ধা করতেন কেবল অগ্রজ হিসেবে নয় স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী একজন শক্তিশালী কবি হিসাবেও। অসংখ্য গান তিনি রচনা করেছিলেন। তবে কোন গ্রন্থ না থাকায় তার অনেক গানকে অন্যেরা হজম করে নিয়েছে।” ১৯৯৫ সালের ১৪ এপ্রিল “লোকসাহিত্যে জালালাবাদ” গ্রন্থের ১৭১ পৃষ্ঠায় লেখক, গবেষক মোঃ আসদ্দর আলী বলেন “বাউল কামাল কবিত্ব শক্তির দিক থেকে অনেকের উর্ধ্বে ছিলেন। কতশত গান যে তিনি রচনা করেছিলেন সেটা বলা সম্ভব নয়। আমার জানামতে তার একজন যোগ্য শিষ্য ধল নিবাসী প্রখ্যাত লোককবি শাহ আব্দুল করিম এখনও জীবিত আছেন। একমাত্র তিনিই প্রচেষ্টা চালালে কামাল সাহেবের অনেক গান সংগ্রহ করতে পারেন বলে আমার বিশ্বাস ”। বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম বলেছেন,কামাল ভাই আমি ও দুরবীন শাহের সিনিয়র উচ্চ শিক্ষিত শিল্পী ছিলেন। আমরা বড় ভাই হিসেবেই তাকে শ্রদ্ধা করতাম। ২০০২ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত “মরমী গানে সুনামগঞ্জ” গ্রন্থের ৩৬ পৃষ্ঠায় সম্পাদক জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আলী খান উলে¬খ করেন, “নিরবে নিভৃতে গান রচনা করে হারিয়ে গেছেন অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী কামাল উদ্দিন। কোন বই পাওয়া যায়নি তাঁর জীবদ্ধশায় কোন স্বীকৃতিও পাননি। তবু যারা তার সমসাময়িক তারা আজও তার গানের সুর মুর্ছনার কথা মনে করেন। তার ভিতর উল্লে¬খযোগ্য শাহ আব্দুল করিম।” জানা যায় সুনামগঞ্জ কলেজে কর্মরত থাকাবস্থায় সাংবাদিক সাহিত্যিক মুহাম্মদ আব্দুল হাই সাহেব প্রতিষ্ঠানের কয়েকটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কামাল পাশাকে এনে বাউল গানের আয়োজন করেন। ওস্তাদ কামাল পাশা বিরচিত “তোর কি রুপ দেখাইয়া,কি যাদু করিয়া/আমারে তোর দেওয়ানা করিলে/পাগল হইয়া বন্ধু পাগল বানাইলে পাগল।। আগে যদি জানতাম,তোর প্রেমে না মজিতাম/জীবনও যৌবনও,না দিতাম তোরে। বহুদিনের পরিনাম,এতদিনে পাইলাম/ভিখারী সাজিলাম তোর মরনওকালে পাগল” এবং “পান খাইয়া যাও ও মাঝি ভাই/ঐ ঘাটে ভিড়াইয়া তোমার নাও”শীর্ষক ভাটিয়ালী গান সর্বপ্রথম কলকাতা গ্রামোফোন রেকর্ডে পরিবেশন করে সুনাম অর্জন করেন উপমহাদেশের বিখ্যাত ভাটিয়ালী গানের শিল্পী জামালগঞ্জের বেহেলী গ্রামের কৃতিসন্তান নির্মলেন্দু চৌধুরী। অনুরুপভাবে প্রেমের মরা জলে ডুবেনাগো দরদী,পারঘাটাতে আমায় করো পার দীনবন্ধুরে,চোরায় করলো ডাকাতি, নদীর স্রোতে নিঝুম রাতে কে যাও তরী বাইয়া, ভাটিয়াল পানে কে যাও বাইয়ারে ঘাটে ভিড়াও নাও,আমি চাইনা দুনিয়ার জমিদারী কঠিন বন্ধুরে/চাইনা দুনিয়ার জমিদারীসহ বেশ কয়েকটি কামালগীতি রেডিও টেলিভিশনে পরিবেশন করেন শিল্পী আব্দুল আলিম। অপ্রতিদ্বন্দ্বী গীতিকার ও সুরকার হিসেবে ১৯৬৪ সালে মহকুমা প্রশাসন কর্তৃক শ্রেষ্ঠ বাউল শিল্পীর পদক লাভসহ গানের সম্রাট উপাধিতে ভূষিত হন। প্রচার বিমুখ নিভৃতচারী এই বাউল সাধক ১৯৮৫ ইং সনের ৬ই মে মোতাবেক ১৩৯২ বাংলার ২০ বৈশাখ শুক্রবার রাত ১২ টায় নিজ বাড়ীতে ইন্তেকাল করেন।
সঙ্গীত সাধনায় বাউল কামাল উদ্দিনের ত্যাগ আদর্শ ও শ্রম আজ বৃথা যায়নি। দেরীতে হলেও ২০০৮ইং সনের ২১ শে ফেব্রæয়ারী বাউল গবেষক শিল্পী সাংবাদিক আল-হেলাল এর সম্পাদনায় ১০১টি গান নিয়ে গীতিগ্রন্থ গানের সম্রাট কামাল উদ্দিন এবং ২০১২ ইং সনের ২২ জানুয়ারী “গানের সম্রাট কামাল পাশা নামে একটি বিশেষ ক্রোড়পত্র এবং ২০১৩ সালে ড. মুজিবুর রহমান চৌধুরীর সম্পাদনায় ৩০১টি গান নিয়ে “কামাল পাশা গীতিসমগ্র” প্রকাশিত হয়েছে। সর্বশেষ আরোও এক হাজার গান সংগ্রহ করে ২য় সংকলন প্রকাশের প্রচেষ্টা রয়েছে অব্যাহত। গত ১৬ জুলাই ২০১২ইং শনিবার সকাল ১১ টায় সুনামগঞ্জের শহীদ আবুল হোসেন মিলনায়তনে মরমী সংস্কৃতিতে সক্রিয় অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ এই মহান শিল্পীকে প্রদান করা হয়েছে ভোরের কাগজ প্রতিনিধি সম্মেলন মরনোত্তর সম্মাননা। সাংবাদিক আল-হেলালের কাছে বাউল কামাল পাশা সম্মাননা স্মারকটি আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেন স্থানীয় সংসদ সদস্য জেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি আলহাজ্ব মতিউর রহমান, মাননীয় বিভাগীয় কমিশনার এন এম জিয়াউল আলম ও জেলা প্রশাসক জনাব ইয়ামিন চৌধুরী মহোদয়গণ।
দীর্ঘ সাধনার জীবনে বাউল কামাল পাশা প্রায় ৬০০০ গান রচনা করেছেন। তার তাত্বিক গানের প্রশংসায় পঞ্চমুখর ছিলেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলহাজ্ব আব্দুস সামাদ আজাদ ও রেলমন্ত্রী, আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কীত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত এমপি,একুশে পদকে ভূষিত সংগীত ওস্তাদ পন্ডিত রামকানাই দাশসহ নাম না জানা আরো অনেকে। এছাড়া একুশে পদকে ভূষিত সংগীত শিল্পী সুষমা দাশ,স্বাধীনতা পূরস্কারে ভূষিত ডাঃ এম.ইউ কবির চৌধুরী ও সাবেক এমপি আলহাজ্ব মতিউর রহমানসহ আরো অনেকেই অত্যন্ত কাছে থেকে এই মহান সাধককে সাধনা করতে দেখেছেন। তাদেরকে সামনে রেখে উপজেলা ও জেলার সংস্কৃতি সেবীরা বিশ্বাস করেন রাষ্ট্র, সরকার ও জাতি এই মহান শিল্পীকে একদিন উপযুক্ত সম্মানে স্বমহিমায় অধিষ্টিত করবেই। যেহেতু বাউল শিল্পীরা কোন দলমতের নয় দেশের আপামর জনসাধানের আত্মার খোরাক যোগানোর জন্য গান রচনা করেন সেহেতু একক ব্যক্তি বা প্রতিণ্ঠানের মাধ্যমে নয় আমি চাই কামালগীতি সবার মাঝে সকল হৃদয়ে প্রাণের সাড়া জাগাক। কামাল সঙ্গীত হোক সকল শ্রেণী পেশার মানুষের মনের খোড়াক। এলক্ষ্যে সুনামগঞ্জ সরকারী কলেজের প্লাটিনাম জয়ন্তী উৎসব-২০২০ইং এর সকল অনুষ্ঠানসুচিকে সামনে রেখে ছাত্র ও শিক্ষক সমাজকেও এগিয়ে আসার জন্য উক্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে আমি উদাত্ত আহবাণ জানাচ্ছি। প্রতি বৎসর বিভিন্ন রাষ্ট্রিয় দিবসে প্রত্যেকটি বিদ্যায়তনে গান ও আলোচনার মাধ্যমে এই মহাণ ভাষা সৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠককে স্মরণ করলে আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কামালগীতি প্রাতিষ্টানিক রুপ লাভ করবে বলে আমি বিশ্বাস করি। পরিশেষে মাতৃভাষা বাংলার মানকে সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে ভাষা আন্দোলনের উপর এই মহান শিল্পীর লেখা গানটি দিয়ে প্রতিবেদনের ইতি টানলাম।
“যারা কেড়ে নিতে চায় মায়ের ভাষা নিদয়া নিষ্ঠুর পাষাণ
ধিক্কার দেই আমি তাদেরে বন্ধু নয় তারা বেঈমান।।
জাতিতত্তে¡র দোহাই দিল ভারতকে খন্ড করিলো
ভাষার উপর আঘাত হানলো,দাবী করে মুসলমান।।
ভন্ড খাজা নাজিমুদ্দিন,বাঙ্গালীদের রাখতে অধীন
শোষণ করে চিরদিন,কেড়ে নিলো তাজা প্রাণ।।
মোদের গর্র্ব মোদের আশা,সবার উর্ধ্বে বাংলা ভাষা
বলে বাউল কামাল পাশা,মাতৃভাষার রাখবো মান ”।।
লেখক : আল-হেলাল,সাংবাদিক,কলামিস্ট ও বাউল শিল্পী এবং প্রতিষ্ঠাতা আহবায়ক বাউল কামাল পাশা স্মৃতি সংসদ,সুনামগঞ্জ।
এল//দৈনিক দেশতথ্য //ঢাকা //
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post