আল হেলাল,সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি : প্রকল্পটির অফিশিয়াল কার্যাদেশ দেওয়া হয় ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে। কাজ সম্পন্ন করার অফিশিয়াল সময়সীমা বা ডেডলাইন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বরে। বাস্তবে সুনামগঞ্জ-বিশ্বম্ভরপুর সড়কের উন্নয়ন,রাধানগর ব্রিজ এবং বেশ কিছু কালভার্ট নির্মাণ কাজ” নামের ঐ মেঘা প্রকল্পটিতে চলছে দুই নম্বরী কাজ কারবার। কাজটির সিংহভাগ অংশ এখনও বাকি রয়েছে এবং বর্তমানে এটি প্রাথমিক ও মাঝারি পর্যায়ের অগ্রগতির (আনুমানিক ৩০% থেকে ৪০% এর কাছাকাছি) মধ্যে রয়েছে বলে কাগজেপত্রে দাবী করা হলেও এ পর্যন্ত সিকিভাগ কাজও সম্পন্ন করেনি প্রতিষ্ঠানটি।
বাস্তবায়নকারী ঠিকাদার কোম্পানী গোপালগঞ্জের “এমডি বদরুল ইকবাল লিমিটেড” সুনামগঞ্জে মূলত সড়ক ও সেতু উন্নয়নের ঐ বড় সরকারি মেগা প্রজেক্টের কাজ ভাগিয়ে নেয় বিগত সরকারের আমলে। এই পুরো প্রকল্পটির আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা। প্রকল্পের মূল দরপত্র বা কার্যাদেশ গোপালগঞ্জ জেলার বদরুল ইকবাল লিমিটেড পেলেও, তারা মাঠ পর্যায়ে কাজ পরিচালনার জন্য শফিকুল ইসলাম নামের একজন ঠিকাদারকে অংশীদার হিসেবে নিয়োগ দেয়। সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক কোন্দল, অংশীদারিত্বের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং চাঁদা দাবির মতো অনাকাংকিত ঘটনার কারণে গণমাধ্যমে এই প্রকল্পটির কাজের অগ্রগতির বিষয়ে বেশ কিছু সংবাদ প্রকাশিত হয়।
স্থানীয় জনসাধারণের অভিযোগ, সড়কটির কিছু অংশের কার্পেটিং ও সংস্কার কাজ সম্পন্ন হলেও কাজের মান নিয়ে জনমনে ক্ষোভ রয়েছে। পিচ বা গালা দেওয়ার পরেই পাথর উঠে যাওয়ার মতো ঘটনার কারণে স্থানীয় জনগণ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। স্থানীয় জনসাধারণের অভিযোগের প্রেক্ষিতে সুনামগঞ্জ ৪ (সদর বিশ্বম্ভরপুর) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুল বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকালে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এর আগেই প্রকল্পস্থলে উপস্থিত ছিলেন সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ জহিরুল ইসলাম,উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মোঃ সাজেদুর রহমান ও উপ সহকারী প্রকৌশলী শামীম হোসেন।
এসময় আরো উপস্থিত ছিলেন, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা হারুনুর রশিদ, সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মদিনা আক্তার,বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক সলুকাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক মেম্বার মোঃ আব্দুল হাই,জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সিনিয়র সদস্য এডভোকেট শেরেনুর আলী, বিএনপি নেতা মোঃ রেজাউল হক,জেলা বিএনপির সাবেক উপদেষ্ঠা ও বিশ^ম্ভরপুর উপজেলা বিএনপির সদস্য মোঃ আব্দুস সাত্তার, জেলা বিএনপি নেতা মোঃ জামাল উদ্দিন বাকের,সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা বিএনপির আহবায়ক ফারুক আহমদ লিলু, পৌর বিএনপি নেতা মোরশেদ আলম,জেলা যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক মমিনুল হক কালারচাঁন,সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুল হাসান রাজু,জেলা যুবদলের যোগাযোগ বিষযক সম্পাদক সুজন মাহমুদ,জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়ক মুনাজ্জির হোসেন,সদস্য সচিব ও জেলা ছাত্রদলের সাবেক আহবায়ক মোঃ জাহাঙ্গীর আলম,শাহজাহান মিয়া,সদর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়ক নুর জালাল মন্টি,সদর উপজেলা জাসাসের আহবায়ক মোঃ আনোয়ার পারভেজ,সুনামগঞ্জ পৌর যুবদলের আহবায়ক আজিজুর রহমান সৌরভ, সদর যুবদল নেতা জুলফিকার আলম,সদস্য সচিব আবু সাঈদ,বিশ^ম্ভরপুর উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব জাহাঙ্গীর আলম ও জেলা ছাত্রদলের সাবেক আহবায়ক কমিটির সদস্য নাঈম আহমদ শিশিরসহ বিভিন্ন দলমতের স্থানীয় নাগরিকবৃন্দ।
কিছুক্ষন পর প্রকল্পস্থানে এসে হাজির হন বাংলাদেশ স্থলবন্দর শ্রমিকলীগ (রেজি: নং বি-২১৪৭) এর কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও তাহিরপুরের বালিজুরি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ আজাদ হোসেন। তিনি সাংবাদিকদের কাছে নিজেকে ঐ প্রকল্পের ঠিকাদারের বৈধ পার্টনার বলে দাবী করে বলেন,প্রকল্পের শুরুতে তিনি নিজে প্রকল্পের কাজ করান। পরে তাকে মামলায় ফাসিয়ে ঐ কাজটি ভাগিয়ে নেয় তাহিরপুরের শফিকুল ইসলাম। আজাদ হোসেন বলেন,ভূয়া ঠিকাদার শফিকুল ইসলাম সুনামগঞ্জ সওজের বর্তমান ও সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলীকে ম্যানেজ করে ভূয়া বিলও হাতিয়ে নিয়েছে। অথচ অংশীদার হিসেবে টেন্ডার সিকিউরিটি,ব্যাংক গ্যারান্টি,১ম ও ২য় বিল বাবত নিয়োগকৃত ঠিকাদার ও তার সহযোগী শফিকুল ইসলাম আমার কাছ থেকে ইতিমধ্যে ১৯ কোটি,৬৫ লক্ষ,৩৪ হাজার,৯ শত ২৩ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। সুনামগঞ্জ সদর আসনের সংসদ সদস্য এডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুলের কাছে দায়েরকৃত অভিযোগের উদ্ধৃতি দিয়ে আজাদ হোসেন বলেন, আমার সাথে পরিকল্পিত জালিয়াতি প্রতারনা ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে ঠকানোর অভিযোগে আমি প্রাবাসী কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর কাছে বিচারপ্রার্ধী হলে তিনি সদয় হয়ে আমার আনিত অভিযোগের ব্যাপারে ফায়সালা করার জন্য অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ফজলে রাব্বী ও শফিকুল ইসলামকে আদেশ দিলে টাকা গ্রহনের কথা স্বীকার করার পরও সময় ক্ষেপন করে যাচ্ছে। আজাদ হোসেন নিরুপায় হয়ে তার বিনিয়োগকৃত টাকা ফেরত প্রদানের জন্য ঠিকাদারের পক্ষে টাকা গ্রহনকারী শফিকুল ইসলাম ও সহযোগী সংশ্লিষ্ট দুর্নীতিবাজ অফিসার ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য এমপি এডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুলের সহযোগীতা কামনা করেন।
সুনামগঞ্জ ৪ আসনের সংসদ সদস্য এডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুল বলেন,মেঘা প্রকল্পের এই কাজটি আমার নির্বাচনী এলাকার মধ্যে অবস্থিত। এটা কারা কিভাবে করছে আমি আদৌ জানতামনা। ২৭ অক্টোবর মঙ্গলবার সলুকাবাদ ইউনিয়নের রতারগাঁও গ্রামে একটি সামাজিক প্রোগ্রামে গেলে উপকারভোগী এলাকাবাসী বিষয়টি আমার নজরে আলোকপাত করেন। আমি শহরে ফেরার পথে প্রকল্পস্থানে দাড়িয়ে নির্মাণকাজের সাথে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও তার ভাগীদারকে পাওয়াতো দূরের কথা সাইড কন্ট্রাকটার,শ্রমিক মজুর বা তাদের প্রতিনিধি কাউকে খুজে পাইনি। এ অবস্থায় আমি নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের সরকারি অফিসারগনকে অনুরোধ করি প্রকল্পস্থানে ভিজিট করতে। আজ এখানে সরজমিনে এসে প্রকল্পের কাজ দেখতে গিয়ে কেচো কুড়তে সাপ বেড়িয়ে এসেছে। নিয়োগকৃত ঠিকাদার নাকি বিদেশে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এটা আমার কথা নয় ঐ ঠিকাদারের ভাগীদার লিখিত অভিযোগে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। সংসদ সদস্য আরো বলেন,প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে এখানে অন্যায়ভাবে শুধু সময় ক্ষেপন করা হয়নি বরং কাজেও মারাত্মক গাফিলতি পরিলক্ষিত হয়েছে। সিডিউল মোতাবেক বালি,ভিটবালি,পাথরসহ অন্যান্য উপকরন সঠিকভাবে ব্যবহার না করে জগাখিচুরি পাকানো হচ্ছে। ঠিকাদার,ভাগীদার ও তাদের স্থানীয় সুবিধাভোগীদের স্বার্থরক্ষাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে প্রকল্পের কাজে পুকুরচুরি করা হচ্ছে। বরাদ্দের পরিমাণ বাড়িয়ে রাষ্ট্রের টাকা অন্যায়ভাবে লুটতরাজ করা হচ্ছে। নিজের বিরুদ্ধে আনা এক কোটি টাকা চাঁদা দাবীর অভিযোগটিকে উদ্দেশ্যমূলক মিথ্যা বানোয়াট ভিত্তিহীন উল্লেখ করে এডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুল বলেন,মেঘা প্রকল্পের কাজে নজরদারী করার কারণে কুচক্রিমহল আমার বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছে। কিন্তু আমি চাই একেবারে ঠিকমত প্রকল্পটির কাজ সম্পন্ন করা হউক। এখানে প্রকল্প কাজ বাস্তবায়নের নামে কোন ধরনের অনিয়ম দুর্নীতি আমি বা আমার এলাকার জনগন বরদাশত করবনা।
সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সিনিয়র সদস্য এডভোকেট শেরেনুর আলী বলেন, সুনামগঞ্জ-বিশ্বম্ভরপুর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পটির আওতায় রাধানগর ব্রিজ এবং বেশ কিছু কালভার্ট নির্মাণের কাজ স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মেগা উদ্যোগ। এই প্রকল্পটি সুনামগঞ্জ জেলা সদর এবং বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মানুষের যাতায়াত সহজ করতে বড় ভূমিকা রাখবে।
এজন্য প্রায় ১৬.১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটির উন্নয়ন ও সংস্কার কাজ সড়ক প্রশস্ত ও শক্তিশালীকরণ করতে হবে। সড়কের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট রাধানগরে আধুনিক পিসি গার্ডার/আরসিসি ব্রিজ নির্মাণ করতে হবে। হাওর অঞ্চলের পানি নিষ্কাশন ও বন্যা পরিস্থিতি বিবেচনায় সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে পর্যাপ্ত কালভার্ট নির্মাণ করত: কালভার্ট ও ড্রেনেজ অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন,হাওর অঞ্চলের ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জ এবং বিভিন্ন সময়ে সৃষ্ট প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে মাঝে মাঝে কাজের গতি ব্যাহত হলেও, এটি সম্পন্ন হলে বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুরসহ সংশ্লিষ্ট এলাকার অর্থনৈতিক ও পর্যটন খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।
এল//দৈনিক দেশতথ্য //ঢাকা //
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post