এস এম জামাল, কুষ্টিয়া প্রতিনিধি:
ঢাকার শহরে যেন টাকার ছড়াছড়ি। গ্রামের মানুষও চিকিৎসার প্রয়োজনে রাজধানীতে গিয়ে হাজার হাজার টাকা খরচ করে আসেন। কেউ আসেন সুস্থ হওয়ার আশায়, কেউ আসেন প্রিয়জনকে বাঁচানোর আকুতি নিয়ে। আর কেউ কেউ আসেন চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে নিজেদের সামর্থ্যের শেষ সীমাটুকু পরীক্ষা করতে।
রাজধানীর অভিজাত এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে বসে যখন চিকিৎসার জন্য অপেক্ষমাণ রোগী ও স্বজনদের মুখের দিকে তাকাই, তখন মনে হয়, এই শহরে টাকা থাকলে অনেক দরজা খুলে যায়। কিন্তু টাকা না থাকলে অসুস্থতা নিয়েও মানুষকে কতটা অসহায় হয়ে পড়তে হয়, সেই গল্পগুলো হয়তো আড়ালেই থেকে যায়।
সম্প্রতি কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় আসা আমার এক ভাগনে ওয়াসিমের চিকিৎসাকে ঘিরে এমনই কিছু অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। সেই অভিজ্ঞতা আমাকে নতুন করে ভাবিয়েছে, চিকিৎসা কি কেবল অর্থের সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করবে, নাকি একজন অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার অধিকারও সমান গুরুত্ব পাবে?
চিকিৎসকের সিরিয়াল পেতে দেড় মাসের অপেক্ষা
ভাগনে ওয়াসিমের পায়ের লিগামেন্টে সমস্যা। প্রথমে কুষ্টিয়ার জেলা শহরে চিকিৎসক দেখানো হয়। কিন্তু পরবর্তী চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
প্রখ্যাত চিকিৎসক ডা. ওয়াকিল আহমেদকে দেখানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তিনি জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি ধানমন্ডির শংকর এলাকায় ইবনে সিনা হাসপাতালে চেম্বার করেন।
কিন্তু তাঁর সিরিয়াল পাওয়া সহজ নয়। সিরিয়ালের জন্য যোগাযোগ করে জানা গেল, অপেক্ষা করতে হবে প্রায় দেড় মাস।
এদিকে রোগীর সমস্যা, পরিবারের দুশ্চিন্তা আর দ্রুত চিকিৎসা করানোর তাগিদ। ভাগনে আমাকে বারবার অনুরোধ করতে লাগল। কুষ্টিয়া ও ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় আমার পরিচিতজন থাকার বিশ্বাস থেকেই তার এই প্রত্যাশা।
শেষ পর্যন্ত সরাসরি চিকিৎসকের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে তাঁর সঙ্গে কথা বললাম। নিজের পরিচয় দিয়ে রোগীকে দেখানোর প্রয়োজনীয়তা জানালে তিনি সম্মতি দিলেন।
এরপর গাড়ি ভাড়া করে রোগীসহ কয়েকজনকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলাম।
তবে হাসপাতালে গিয়ে সিরিয়াল-সংক্রান্ত দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির কাছে বিষয়টি জানাতে গেলে নানা কথা শুনতে হলো। মনে হলো, বাঁশের চেয়ে কঞ্চি বড় হওয়ার মতো পরিস্থিতি। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সূত্র ধরে তিনি রোগীকে ভেতরে ডেকে নিলেন। আমিও সঙ্গে গেলাম।
প্রাথমিকভাবে ওষুধ লিখে দিলেন, কিছু ব্যায়াম শিখিয়ে দিলেন এবং পরবর্তী সময়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতিবেদন নিয়ে আসতে বললেন।
আমরা কুষ্টিয়ায় ফিরে এলাম। কিন্তু চিকিৎসার এই অধ্যায় যে এতটা ব্যয়বহুল ও ক্লান্তিকর হয়ে উঠবে, তা তখনো বুঝতে পারিনি।
কুষ্টিয়া থেকে আবারও রাজধানীর পথে
নির্দেশনা অনুযায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করে আবারও ঢাকায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিলাম। এবার গন্তব্য সেই ধানমন্ডির শংকরের ইবনে সিনা হাসপাতাল।
দুপুর ২টার দিকে কুষ্টিয়া থেকে বাসে রওনা দিয়ে রাত ৯টার দিকে চিকিৎসক দেখানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু পথের দূরত্ব, যানজট ও নানা কারণে রাত ১২টার দিকে হাসপাতালে পৌঁছালাম।
ততক্ষণে চিকিৎসক চেম্বার থেকে বের হয়ে গেছেন প্রায় আধা ঘণ্টা আগে।
আবারও তাঁকে ফোন করলাম। জানালাম, অনেক কষ্ট করে কুষ্টিয়া থেকে এসেছি। এবার দেখা না হলে আমাদের বিপাকে পড়তে হবে।
তিনি তখন অপারেশন থিয়েটারে ছিলেন। সেখান থেকে পাশের ভবনের জরুরি বিভাগে অপেক্ষা করতে বললেন।
অপেক্ষার পর রাত পৌনে একটার দিকে তিনি এলেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতিবেদন দেখলেন। এরপর জানালেন, রোগীর অপারেশন করতে হবে। এ জন্য ব্যয় হবে প্রায় সোয়া দুই লাখ টাকা।
কথাটি শুনে আমরা চিকিৎসার পরবর্তী ধাপ নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম। রোগী সুস্থ হবে, এটাই আমাদের প্রধান চাওয়া। কিন্তু সেই সুস্থতার পথে অর্থের যে বড় একটি হিসাব রয়েছে, তা এড়ানোর উপায় নেই।
পরবর্তী সময়ে রোগী নিজেই চিকিৎসকের ব্যক্তিগত সহকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করে অপারেশনের দিন-তারিখ ঠিক করল। সিদ্ধান্ত হলো, সকাল ৯টায় হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। কেবিনে থাকতে হবে, অপারেশনের পর অন্তত ৪৮ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে থাকার প্রয়োজন হতে পারে।
কেবিনসহ প্যাকেজের ব্যয় জানানো হলো দুই লাখ টাকা।
রাতের ট্রেনে পাঁচজনের যাত্রা
অপারেশনের দিন ঘনিয়ে এলে আগের রাতে ভাগনে ফোন করে জানাল, আমাকে যেতেই হবে।
ইজিবাইকে উঠে দেখি, রোগীর স্ত্রী, শাশুড়ি ও ভাইও সঙ্গে যাচ্ছে। আমাকে নিয়ে মোট পাঁচজন। সঙ্গে দুটি বড় বস্তায় বালিশ, কম্বল ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।
পোড়াদহ রেলস্টেশন থেকে রাতের ট্রেনে উঠলাম। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্নিগ্ধা কোচে রাতের ঠান্ডা আরও বেশি অনুভূত হচ্ছিল। একসময় বস্তা থেকে কম্বল বের করে শরীরে জড়িয়ে নিলাম। রোগীকে বললাম, হাসপাতালে এত বালিশ-কম্বল নিয়ে থাকা সম্ভব হবে না। কিন্তু তারা জানাল, অসুবিধা হবে না।
এভাবেই রাত পেরিয়ে সকালে চোখ মেলে দেখি, আমরা কমলাপুর রেলস্টেশনে পৌঁছে গেছি।
সেখান থেকে দুটি সিএনজিতে ভাগ হয়ে প্রায় ২০ মিনিটে পৌঁছালাম ধানমন্ডির ইবনে সিনা হাসপাতালে।
কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর হাসপাতালের ক্যান্টিনে ডিম-খিচুড়ি দিয়ে সকালের নাশতা সারলাম। এরপর শুরু হলো ভর্তি হওয়ার প্রক্রিয়া।
হাসপাতালের এক ডেস্ক থেকে অন্য ডেস্কে
সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে রোগী ও স্বজনদের ভিড়ও বাড়তে লাগল।
কোথায় টাকা জমা দিতে হবে, কীভাবে ভর্তি হতে হবে, কেবিন কোথায় পাওয়া যাবে, এসব জানতে এক ডেস্ক থেকে অন্য ডেস্কে ছুটতে হলো। শেষ পর্যন্ত জানতে পারলাম, আগে ভর্তি থাকা রোগীরা ছাড়পত্র নিয়ে চলে গেলে কেবিন অথবা ওয়ার্ডের ব্যবস্থা হবে।
অসুস্থ মানুষের স্বজনদের কাছে হাসপাতালের প্রতিটি মুহূর্তই যেন একেকটি পরীক্ষা। কখনো চিকিৎসকের অপেক্ষা, কখনো কেবিনের অপেক্ষা, কখনো অপারেশনের অপেক্ষা। তার সঙ্গে রয়েছে টাকা জোগাড়, থাকা-খাওয়া ও যাতায়াতের বাড়তি চাপ।
আমার নিজেরও সেদিন আরেকটি জরুরি কাজ ছিল। মায়ের চিকিৎসার জন্য মহাখালীর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে একটি প্রতিবেদন সংগ্রহ করতে হবে।
একদিকে ভাগনের অপারেশন, অন্যদিকে মায়ের চিকিৎসার উদ্বেগ। সবকিছু সামলে একটি সিএনজি নিয়ে ছুটলাম মহাখালীতে। সেখান থেকে মায়ের প্রতিবেদন সংগ্রহ করে চিকিৎসকের হোয়াটসঅ্যাপে পাঠালাম। এরপর আবার যোগাযোগ করলাম, হাসপাতালে তাঁকে কখন পাওয়া যাবে।
এভাবেই একই দিনে দুটি হাসপাতালের মধ্যে ছুটে বেড়াতে হলো আমাকে।
একদিকে ভাগনের চিকিৎসার চিন্তা, অন্যদিকে মায়ের অসুস্থতা। একজন স্বজন হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বুঝতে পারলাম, অসুস্থতা শুধু রোগীকেই কাবু করে না, পুরো পরিবারকেও মানসিক ও আর্থিক চাপে ফেলে দেয়।
অপারেশন থিয়েটারের সামনে অপেক্ষা
এরই মধ্যে খবর এল, ভাগনেকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হবে।
দ্রুত সিএনজি নিয়ে আবার ইবনে সিনায় ফিরলাম। গিয়ে দেখি, তাকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়ার আগের অপেক্ষমাণ কক্ষে রাখা হয়েছে।
এদিকে রোগীর স্ত্রী, শাশুড়ি ও কোলের শিশুটিকে কুষ্টিয়াগামী বাসে তুলে দেওয়া হয়েছে। কারণ, হাসপাতালে কেবিনে অতিরিক্ত মানুষের থাকার সুযোগ নেই। বালিশ-কম্বল নিয়ে সেখানে থাকা নিয়েও সমস্যা হতে পারে।
একটি অসুস্থ মানুষকে ঘিরে পরিবারের কত আয়োজন, কত দুশ্চিন্তা, কত ত্যাগ! অথচ চিকিৎসার প্রয়োজনে রাজধানীতে এসে পরিবারের সদস্যদেরও শেষ পর্যন্ত আলাদা হয়ে যেতে হয়।
সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা বাজে। তখনো ভাগনেকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়নি।
অপেক্ষা করতে করতে চারপাশের মানুষের দিকে তাকালাম। সেখানে আমার মতো আরও অনেক স্বজন রয়েছেন। কারও রোগীর অপারেশন হবে, কারও রোগী চিকিৎসকের অপেক্ষায়, কেউ আবার চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে ব্যস্ত।
চেয়ারে বসে থাকতে থাকতে একপর্যায়ে এক বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিকে বসার জায়গা করে দিয়ে আমি মেঝেতে বসে পড়লাম। শুধু আমি নই, আমার মতো আরও অনেক মানুষকে মেঝেতে বসে অপেক্ষা করতে দেখলাম।
কারও চোখেমুখে ক্লান্তি, কারও মধ্যে উৎকণ্ঠা, আবার কেউ নিজের অসহায়ত্ব আড়াল করতে পাশের মানুষের সঙ্গে গল্প করছেন।
সেই অপেক্ষার মুহূর্তে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষের কথা আমাকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলল।
৮০ টাকার মজুরি, খাশির মাংস ১২০০ টাকা!
পাশে বসা ওই ব্যক্তি নিজের জীবনের হিসাব মেলাতে গিয়ে বললেন, একসময় খাশির মাংসের দাম ছিল কেজিপ্রতি ৮০ টাকা। তখন তাঁর দৈনিক কাজের মজুরিও ছিল ৮০ টাকা।
অর্থাৎ, সারাদিন কাজ করে তিনি এক কেজি খাশির মাংস কিনতে পারতেন।
কিন্তু এখন তাঁর দৈনিক মজুরি ৬০০ টাকা। আর খাশির মাংসের দাম কেজিপ্রতি ১২০০ টাকা।
তাঁর কথার মধ্যে ছিল সময়ের পরিবর্তন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আর সাধারণ মানুষের জীবনযুদ্ধের নির্মম হিসাব।
একজন শ্রমজীবী মানুষ সারাদিন পরিশ্রম করে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় করেন। সেই আয় দিয়ে তাঁকে পরিবারের খাবার, বাসাভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, যাতায়াত ও অন্যান্য খরচ সামলাতে হয়। পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে সেই হিসাব আরও জটিল হয়ে ওঠে।
তখন চিকিৎসা শুধু একটি শারীরিক সমস্যার সমাধান থাকে না, হয়ে ওঠে একটি পরিবারের আর্থিক সক্ষমতার বড় পরীক্ষা।
চিকিৎসার ব্যয় ও আয়ের বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন
অপেক্ষমাণ কক্ষে বসে ভাবছিলাম, একজন শ্রমজীবী মানুষের দৈনিক আয় যেখানে কয়েক শ টাকা, সেখানে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের রোগীপ্রতি ভিজিট যদি ৫০০ টাকা হয় এবং দিনে ১০০ থেকে ১৫০ জন রোগী দেখেন, তাহলে শুধু ভিজিট থেকেই তাঁর দৈনিক আয় দাঁড়াতে পারে ৫০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার টাকা।
অবশ্য সব চিকিৎসকের রোগীসংখ্যা, ভিজিটের হার কিংবা আয়ের হিসাব এক নয়। চিকিৎসকদের দক্ষতা অর্জন, দীর্ঘদিনের অধ্যয়ন, প্রশিক্ষণ, দায়িত্ব ও শ্রমের মূল্যও রয়েছে। তাঁদের ন্যায্য পারিশ্রমিক পাওয়ার অধিকার অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়, চিকিৎসার ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার দায়িত্ব কার?
একজন শ্রমিকের সারা দিনের মজুরি যেখানে একটি পরিবারের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতেই হিমশিম খায়, সেখানে বড় ধরনের অস্ত্রোপচারের জন্য দুই লাখ টাকা জোগাড় করা কতটা কঠিন, তা সহজেই অনুমেয়।
একটি পরিবারের কাছে দুই লাখ টাকা হয়তো কয়েক বছরের সঞ্চয়। কারও জন্য জমি বিক্রি করা, কারও জন্য ঋণ নেওয়া, আবার কারও জন্য আত্মীয়স্বজনের কাছে হাত পাতার নাম।
অথচ রোগী ও স্বজনদের কাছে তখন টাকার অঙ্কের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে প্রিয় মানুষটির সুস্থ হয়ে ওঠা।
আমার ভাগনের অপারেশনের জন্য দুই লাখ টাকার প্যাকেজের কথা জানানো হয়েছে। সেই অর্থের বিনিময়ে চিকিৎসার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা হবে, রোগী সুস্থ হবে, স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। তবে এই অভিজ্ঞতা আমাকে ভাবিয়েছে, দেশের সব মানুষের পক্ষে কি এ ধরনের চিকিৎসার ব্যয় বহন করা সম্ভব?
বিশেষ করে যাঁদের নিয়মিত আয় নেই, যাঁরা দিন এনে দিন খান, তাঁদের পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে তাঁরা কোথায় যাবেন?
সোনার বাংলায় চিকিৎসা কি সবার সাধ্যের মধ্যে?
বাংলাদেশের গ্রাম থেকে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ উন্নত চিকিৎসার আশায় ঢাকায় আসেন। তাঁদের অনেকেই জানেন না কোন হাসপাতালে গেলে কম খরচে ভালো চিকিৎসা পাওয়া যাবে, কীভাবে চিকিৎসকের সিরিয়াল নিতে হবে কিংবা চিকিৎসার প্রকৃত ব্যয় কত হতে পারে।
রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে তাঁদের অনেকের জন্য অপেক্ষা করে দীর্ঘ যাত্রা, অপরিচিত পরিবেশ, থাকা-খাওয়ার বাড়তি খরচ এবং অনিশ্চয়তা।
আমার নিজের অভিজ্ঞতায়, একই দিনে ভাগনের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে গিয়ে মায়ের ক্যানসার-সংক্রান্ত প্রতিবেদন সংগ্রহের জন্যও ছুটতে হয়েছে। একদিকে ভাগনের অপারেশন, অন্যদিকে মায়ের চিকিৎসার চিন্তা। এর সঙ্গে রয়েছে অর্থের হিসাব।
আমি জানি, আমার মতো অসংখ্য মানুষ প্রতিদিন এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। তাঁদের সবার পক্ষে পরিচিত চিকিৎসকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা সম্ভব হয় না। সবাই দেড় মাস অপেক্ষা করার সামর্থ্যও রাখেন না। আবার সবাই দুই লাখ টাকা দিয়ে অস্ত্রোপচার করানোর সামর্থ্যও রাখেন না।
তাই চিকিৎসাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, রোগীদের জন্য সহজলভ্য তথ্য, সরকারি হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাসেবার সম্প্রসারণ এবং ব্যয়বহুল চিকিৎসায় অসচ্ছল মানুষের সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
চিকিৎসার মান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ।
অপারেশন থিয়েটারের সামনে বসে যখন চারপাশের মানুষের মুখের দিকে তাকাই, তখন মনে হয়, প্রত্যেকের পেছনে রয়েছে একেকটি পরিবার, একেকটি গল্প, একেকটি স্বপ্ন। কেউ নিজের বাবাকে সুস্থ করতে চান, কেউ সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত, কেউ আবার স্বামী কিংবা স্ত্রীর সুস্থতার অপেক্ষায় আছেন।
তাঁদের সবার চাওয়া একটাই, প্রিয় মানুষটি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরুক।
চিকিৎসা মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। অসুস্থতা কারও ইচ্ছায় আসে না। তাই চিকিৎসা যেন কেবল অর্থবিত্তের মানুষের জন্য সহজলভ্য না হয়। সাধারণ মানুষও যেন সম্মানজনকভাবে, সময়মতো এবং সাধ্যের মধ্যে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেতে পারেন।
ঢাকার শহরে টাকার ছড়াছড়ি। গ্রামের মানুষও চিকিৎসার জন্য এসে টাকা খরচ করে যান। কেউ সুস্থ হয়ে ফেরেন, কেউ আবার ঋণের বোঝা নিয়ে বাড়ি ফেরেন। আর কারও কারও কাছে চিকিৎসার ব্যয় হয়ে ওঠে সারা জীবনের দুশ্চিন্তা।
হাসপাতালের সেই অপেক্ষমাণ কক্ষে বসে আমার মনে শুধু একটি কথাই বারবার ফিরে আসছিল, একজন মানুষের জীবনের মূল্য কি তাঁর পকেটের টাকার অঙ্ক দিয়ে নির্ধারিত হবে?
আহারে সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।
এল//দৈনিক দেশতথ্য //ঢাকা //
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post