বিশ্ববাজারে বাংলাদেশী সম্ভাবনাময় চিংড়ির অনিশ্চিত ভবিষ্যতের বার্তা বেশ আগে থেকেই পাওয়া যাচ্ছিল। তবে, বর্তমানে কেজি প্রতি ১ হাজার টাকা বাগদা চিংড়ি দেশী বাজারে মিলছে ৪ শ’ থেকে ৫ শ’ টাকায়। সাধারণ হরিণা, চালিসহ অন্যান্য চিংড়ির দাম কেজি প্রতি ৫ শ’ টাকা হলেও বাগদার এমন আকষ্মিক দরপতনে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন চিংড়ি চাষী থেকে শুরু করে এর সাথে সংশ্লিষ্টরা।
বাগদা চিংড়ির অস্বাভাবিক দর পতনে সুন্দরবন উপকূলীয় খুলনা অঞ্চলের চিংড়ি সংশ্লিষ্টরা রীতিমত হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়েছেন। আন্দোলনের মুখে মৌসুমের শুরুতেই লোনা পানির উত্তোলন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এরপর অনাবৃষ্টি, চিংড়িতে অস্বাভাবিকহারে মড়কসহ নানা জটিলতার মধ্যে মাঝ পথে চিংড়ির সহনশীল বাজার দরে মোটামুটি সন্তুষ্ট ছিলেন চাষীরা। গত প্রায় দু’বছর করোনার ধকল কাটিয়ে নানা সংকটের পরও টিকে থাকা শিল্প সংশ্লিষ্টরা আশায় বুক বেঁধে ছিলেন। তবে গেল কয়েকমাসে একের পর এক দরপতনে লোকসানের মুখে থেকেও বর্তমান বাজার দরে রীতিমত হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়েছেন চিংড়ি চাষী, প্রক্রিয়াকরণ, ব্যবসায়ীসহ ডিপো মালিকরা।
আগামীতে লবণ ও মিষ্টি পানির পক্ষে-বিপক্ষে শঙ্কার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশী চিংড়ির চাহিদাসহ নানা সংকটে চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে রাতারাতি সাদা সোনা বনে যাওয়া চিংড়ির বাণিজ্যিক ভবিষ্যত।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানাযায়, লবণ পানি অধ্যুষিত উপকূলীয় খুলনা অঞ্চলের বৃহত্তর পাইকগাছা-কয়রার অধিকাংশ মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম মাধ্যম চিংড়ি। তবে গত কয়েক বছরে দফায় দফায় অস্বাভাবিক দরপতনে টিকে থাকার লড়াইয়ে সর্বশেষ পরিস্থিতি নতুন করে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পাইকগাছায় ১৭ হাজার ৭৫ হেক্টর ও কয়রা উপজেলায় ৬ হাজার ৭৪০ হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষ করা হচ্ছে। এ অঞ্চলের চিংড়ি দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে সরকার প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে থাকে। চিংড়ী চাষ অধ্যুষিত এ অঞ্চলে ৮০’র দশক থেকে মূলত বানিজ্যিকভাবে চিংড়ি চাষ শুরু হয়। জেলার একটি বৃহৎ অংশজুড়ে চাষ হয় বাগদা চিংড়ি।
খুলনা জেলা মৎস্য অফিসের তথ্যমতে, জেলায় বাগদা চিংড়ির ঘের রয়েছে ২৩ হাজার ৪৪০টি। তম্মধ্যে ডুমুরিয়ায় ৭ হাজার ৮২১টি, কয়রা ৭ হাজার ২০০টি, পাইকগাছায় ৩ হাজার ৯৪০টি, দাকোপে ২ হাজার ৫১৬টি, বটিয়াঘাটায় ৮১১টি, রূপসায় ১ হাজার ১৫১টি ও তেরখাদায় ১টি ঘের রয়েছে।
সোনালী আঁশ পাট শিল্প ধংসের পর এবার রপ্তানি আয়ের অন্যতম খাত চিংড়ি শিল্পও ক্রমশ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌছেছে। চিংড়ি রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩শ’ মিলিয়ন পাউন্ড বা প্রায় দশ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হলেও তার অর্ধেকও পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। বরং প্রতি বছর রপ্তানি আয় তিন থেকে চারশ’ কোটি টাকা কমছে। ২০১১-১২ সালে চিংড়ি রপ্তানি করে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ ৫৮০ মিলিয়ন ডলার বা ৪ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা আয় করেছিল। সে আয় কমতে কমতে গত ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে আয় হয়েছে ৪ হাজার ২১১ কোটি টাকা। যা প্রায় চারশ’ কোটি টাকার মতো কম। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে ২৯ কোটি ৪৯ লাখ ডলারের হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি হয়েছে, যা দেশি মুদ্রায় প্রায় ২ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৮৬ টাকা ধরে)। এই আয় তার আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪০ শতাংশ বেশি। অবশ্য চিংড়ির বৈশ্বিক বাজারের তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ খুবই নগণ্য। আগের ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ৭ মাসে রপ্তানি হয়েছিল ২১ কোটি ডলার বা ১ হাজার ৮০৬ কোটি টাকার হিমায়িত চিংড়ি। এই শতাব্দীতে দেশ থেকে সর্বোচ্চ ৫৫ কোটি ডলারের চিংড়ি রপ্তানি হয়েছিল ২০১৩-১৪ অর্থবছরে। তারপর টানা সাত বছর পণ্যটির রপ্তানি কমেছে। সর্বশেষ গত ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩৩ কোটি ডলারের চিংড়ি রপ্তানি হয়েছে, যা দেশি মুদ্রায় ২ হাজার ৮৩৮ কোটি টাকা। এই আয় তার আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ১৫ শতাংশ কম। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বিশ্বব্যাপী চিংড়ির বাজার ছিল ৩ হাজার ১৬০ কোটি ডলারের, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২ লাখ ৭১ হাজার কোটি টাকা। ২০২৭ সালে এই বাজার বেড়ে ৫ হাজার ৪৬০ কোটি ডলারে দাঁড়াবে। তবে সর্বশেষ পরিস্থিতি সব সমীক্ষাকে পেছন ফেলে চিংড়ি শিল্পের টিকে থাকার লড়াইয়ে সংকটের পাল্লায় নতুন করে ঘি ঢেলেছে।
সংশ্লিষ্ট শিল্পে কয়েক বছরের রুগ্নাবস্থার সর্বশেষ দরপতনের পেরেক উঠিয়ে নতুন করে ফের মাথা উচু করে দাঁড়াতে পারবে কি ছিংড়ি? নাকি সংকটের পাল্লা ভারী করে ক্রমশ অনিশ্চয়তার দিকেই এগিয়ে যাবে? চিংড়ি চাষী থেকে শুরু করে এর সাথে সংশ্লিষ্টদের এমন নানা প্রশ্নের মুখে সত্যিই চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে চিংড়ি শিল্প।
পাইকগাছা চিংড়ী চাষী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম কিবরিয় রিপন বলেন, চরম সংকটের মুখে দেশী খুচরা বাজারে প্রতি কেজি বড় সাইজের বাগদা বিক্রি হচ্ছে ৪ শ’ থেকে সাড়ে ৪ শ’ টাকায়। চিংড়ির এমন দরপতনে কৃষি, কৃষক, সংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি সরকারও প্রতি বছর সরকারও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন থেকে বঞ্চিত হবে।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো: টিপু সুলতান বলেন, বর্তমান আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক মন্দা, বাংলাদেশী চিংড়ির মাণসহ নানা সংকটে বর্তমানে চিংড়ির দরপতন হয়েছে। সংকট উত্তরণে বিশ্ববাজারে নতুন মোকামের সন্ধান চলছে। এসময় অপর এক প্রশ্নের জবাবে বর্তমান বিশ্ববাজারে চাহিদার সাথে সংগতি রেখে আগামীতে লবণপানির উত্তোলনসহ অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবেলা করা না গেলে ভবিষ্যতে চিংড়ির অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, অচীরেই সকল সংকট মোকাবেলা করে এগিয়ে যাবে চিংড়ি।
জা// দৈনিক দেশতথ্য// ২৯ অক্টোবর, ২০২২//
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post