স্টাফ রিপোর্টার:
কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) থানা এলাকায় মাদকদ্রব্যের বিস্তার, চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, থানার আওতাধীন সাতটি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে ও গোপনে মাদক কেনাবেচা চলছে। মাদকের বিস্তারের পাশাপাশি চুরি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধও বাড়ছে বলে দাবি এলাকাবাসীর।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানা সাতটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই মাদকের বিস্তার রয়েছে। বিশেষ করে পাটিকাবাড়ী, গোস্বামী দুর্গাপুর, মনোহরদিয়া ও ঝাউদিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় মাদকের প্রকোপ বেশি বলে অভিযোগ রয়েছে। উজানগ্রাম ও হরিনারায়ণপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকাতেও সহজে মাদক পাওয়া যায় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
শিক্ষার্থী-তরুণদের নিয়ে উদ্বেগ
এলাকাবাসীর অভিযোগ, মাদকের সহজলভ্যতার কারণে কিশোর ও তরুণদের একটি অংশ ধীরে ধীরে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও কেউ কেউ মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছেন বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা। এতে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
মাদকাসক্ত সন্তানদের নিয়ে একাধিক অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাদের অসহায়ত্বের কথা জানিয়েছেন। বিদেশে থাকা এক বাবা প্রতিবেদককে জানান, মাদকের কবল থেকে সন্তানকে দূরে রাখতে প্রয়োজনে পুলিশ দিয়ে তাকে আটক করার ব্যবস্থা করার অনুরোধও জানিয়েছেন তিনি। পরিবারের এক মা সন্তানের বর্তমান অবস্থার কথা বলতে গিয়ে প্রায়ই কান্নায় ভেঙে পড়েন বলেও জানান স্বজনরা।
মাদকের সঙ্গে বাড়ছে অন্যান্য অপরাধের শঙ্কা
স্থানীয়দের মতে, মাদকের বিস্তারের সঙ্গে চুরি, ছিনতাইসহ অন্যান্য অপরাধেরও যোগসূত্র রয়েছে। তাদের দাবি, মাদক কেনার অর্থ জোগাড় করতে কেউ কেউ চুরি-ছিনতাইসহ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে মাদকের বিস্তার এখন শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যা নয়; এটি জননিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার আশপাশের বিভিন্ন সড়ক ও এলাকাকে ব্যবহার করেও মাদক পরিবহন ও কেনাবেচা হচ্ছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি প্রবেশপথ ব্যবহার করে মাদক ক্যাম্পাসে পৌঁছানোর অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
প্রশাসনের সঙ্গে ‘লিয়াজোঁ’র অভিযোগ
কয়েকজন এলাকাবাসী অভিযোগ করেছেন, মাদক কারবারিদের সঙ্গে প্রশাসনের কোনো কোনো সদস্যের ‘লিয়াজোঁ’ থাকার কারণেই তারা নির্বিঘ্নে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এই অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগগুলো তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করা হোক। একই সঙ্গে মাদক কারবারিদের সঙ্গে কোনো পুলিশ সদস্য বা প্রশাসনের কারও যোগসাজশ থাকলে তদন্তের মাধ্যমে তা শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
নতুন ওসির ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানায় নতুন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছিলেন নবাগত ওসি এস এম মামুনুর রশিদ। তিনি ২৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ইবি থানায় দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
দায়িত্ব গ্রহণের সময় সাংবাদিকদের তিনি মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণের কথা জানান। মাদক নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তিনি।
তবে দায়িত্ব গ্রহণের এক সপ্তাহ পার হলেও মাদকবিরোধী অভিযানে দৃশ্যমান বড় ধরনের কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের প্রশ্ন, ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি মাঠপর্যায়ে বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে?
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, শুধু বক্তব্য বা ঘোষণা নয়—মাদকের উৎস, সরবরাহকারী ও বিক্রেতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে কার্যকর অভিযান পরিচালনা করা হবে। পাশাপাশি মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন, শিক্ষার্থী ও তরুণদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং চুরি-ছিনতাই প্রতিরোধেও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয়দের মতে, ইবি থানা এলাকায় মাদক, চুরি, ছিনতাই, সন্ত্রাস ও সংঘর্ষসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের দৃশ্যমান তৎপরতা বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে মাদকের বিস্তার ঠেকাতে নিয়মিত অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে টহল এবং মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
তাদের ভাষ্য, মাদকের ভয়াবহতা থেকে কিশোর-তরুণদের রক্ষা করা না গেলে এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি পুরো সমাজকে বহন করতে হবে। তাই নতুন ওসির ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি যেন শুধু বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চান এলাকাবাসী।
এল//দৈনিক দেশতথ্য //ঢাকা //
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post