স্টাফ রিপোর্টার : চট্টগ্রামসহ দেশের কয়েকটি জেলায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও এখনো দুর্ভোগ কাটেনি বানভাসি মানুষের। কোথাও কোথাও পানি কমতে শুরু করলেও নতুন করে বৃষ্টির কারণে আবারও বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় সহায়তার সংকটে দিন কাটাচ্ছেন অনেক মানুষ।
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের সৌদিপ্রবাসী আক্কাস আলীর পাকা ঘরেও এখন হাঁটুপানি। বন্ধ হয়ে গেছে রান্নাবান্না। ঘরে কোনো পুরুষ সদস্য না থাকায় দুই সন্তানকে নিয়ে বিপাকে পড়েছেন গৃহবধূ আসমা বেগম। তিনি বলেন, “বিল্ডিং ঘরে থাকি বলে মানুষ মনে করে আমরা ভালো আছি। আমাদের হাতে কিছু টাকা আছে, কিন্তু সেই টাকা দিয়ে খাবার ও বিশুদ্ধ পানি আনার মতো পরিস্থিতি নেই।”
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ৫ জুলাই থেকে অতিবৃষ্টিজনিত বন্যায় জেলায় প্রায় ৫ লাখ ৯৫ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ পর্যন্ত মারা গেছেন ১৩ জন এবং আহত হয়েছেন ১২ জন। জেলার ৫৮০টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় ২১ হাজার ৯০০ মানুষ।
গতকাল থেকে অনেক আশ্রয়কেন্দ্রের মানুষ নিজ নিজ বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছেন। ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে সড়ক ও রেল যোগাযোগ।
সরকারি হিসাবে, চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলা, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের ৫৮টি উপজেলার প্রায় সোয়া ১০ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন। বন্যায় এ পর্যন্ত সারাদেশে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১ জনে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে মারা গেছেন ২৫ জন।
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় মাঠ প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, দুর্গতদের মধ্যে ৭১০ টন চাল, প্রায় ৬০ লাখ টাকা এবং ৩৯ হাজার ২৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি আরও ৪৯০ টন চাল ও নগদ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম নগরীতে আবারও ভারী বৃষ্টিতে বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত নগরের বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তিনি বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা সমন্বিতভাবে কাজ করছেন। দুর্গতদের জন্য খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
তিনি চান্দগাঁও সিঅ্যান্ডবি, মোহরা ও দক্ষিণ কাট্টলি এলাকা পরিদর্শন করে পানিবন্দি মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেন। এ সময় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ ও সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান উপস্থিত ছিলেন।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খন্দকার মাহমুদুল হাসান জানান, উপজেলার প্রধান সড়কগুলো থেকে পানি নেমে গেছে। তবে নিচু এলাকাগুলোতে এখনো পানি রয়েছে। দুর্ভোগ কমাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে।
চন্দনাইশ উপজেলায় বৃষ্টি কমায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে এখনো প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। দোহাজারী পৌরসভার কিল্লাপাড়ার বিধবা রোজী আকতার জানান, গত সপ্তাহের বুধবার থেকে তার ঘরে হাঁটুপানি। খাবারের সংকট রয়েছে। তিনি সরকারি সহায়তা হিসেবে ১০ কেজি চাল পেয়েছেন।
সাতবাড়িয়া এলাকার আবু তাহের বলেন, এক সপ্তাহ ধরে পানির মধ্যে দুর্ভোগ পোহালেও এখনো কোনো সহায়তা পাননি। চন্দনাইশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুর রহমান জানান, ২৭টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে এবং এ পর্যন্ত ১৫০ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিভাগ ছাড়া দেশের অন্যান্য এলাকায় উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হবে। আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ১৩, ১৫ ও ১৬ জুলাই চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড এবং এ বিভাগের পাঁচ জেলায় মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা স্থগিত থাকবে।
পাঁচ দিন বন্ধ থাকার পর গতকাল আবার চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল শুরু হয়েছে। দুপুর দেড়টায় চট্টগ্রাম রেলস্টেশন থেকে পর্যটক এক্সপ্রেস কক্সবাজারের উদ্দেশে ছেড়ে যায়।
কক্সবাজারে বন্যা ও পাহাড় ধসে পরিস্থিতি এখনো ভয়াবহ। গত শনিবার রাতে শহরের পূর্ব কলাতলী ঝরঝরিপাড়া এলাকায় পাহাড় ধসে রোজিনা বেগম নামে এক গৃহবধূ মারা যান। একই সঙ্গে চকরিয়ায় বন্যার পানিতে ডুবে ১২ বছর বয়সী সজীব জলদাসের মৃত্যু হয়েছে।
এর আগে পেকুয়ায় বন্যার পানিতে ডুবে ২১ মাস বয়সী শিশু মুশফিকুর রহিম মারা যায়। এ নিয়ে ৫ জুলাই থেকে জেলায় পাহাড় ধস, পানিতে ডুবে ও দেয়ালচাপায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮ জনে।
জেলায় এখনো প্রায় আড়াই লাখ মানুষ পানিবন্দি। চকরিয়া, পেকুয়া, মাতামুহুরী, রামু ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে রয়েছে।
চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের বাসিন্দা মোহাম্মদ হোছাইন বলেন, “পুরো এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেকে অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। ঘরবাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”
পেকুয়ার টৈটং ইউনিয়নের দক্ষিণ সোনাইছড়ি ভেলুয়াপাড়ার বাসিন্দা সাফুরা খাতুন জানান, টানা বৃষ্টিতে তার মাটির ঘর ভেঙে গেছে। প্রতিবেশীদের সহায়তায় খাবার পেলেও সরকারি সহযোগিতা এখনো পাননি।
কাকারা এলাকার আব্দুর রশিদ বলেন, “বাড়িঘর পানিতে তলিয়ে গেছে। উঁচু মাচায় আশ্রয় নিতে হচ্ছে। বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে।”
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, জেলার ৭১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬৯টি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুই থেকে আড়াই লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। দুর্গতদের জন্য ৩০ লাখ টাকা ও ৪৫০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
বান্দরবানে পানি ধীরে ধীরে কমলেও এখনো ৪৯ হাজার ৫০০ মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। নারী ও শিশুসহ ৪ হাজার ৭৪৫ জন আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন।
পাহাড় ধস ও সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জেলার বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। চন্দ্রঘোনা-রাঙামাটি সড়কের ব্রিজঘাটা এলাকায় বেইলি ব্রিজ ভেঙে যাওয়ায় সরাসরি যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।
রুমা, রোয়াংছড়ি, থানচি, লামা ও আলীকদম উপজেলায় পানি কমলেও বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক এখনো স্বাভাবিক হয়নি। আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনজুর আলম জানান, উপজেলার চার ইউনিয়নে ১ হাজার ৩৩০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এসএম মঞ্জুরুল হক জানান, আশ্রয়কেন্দ্র ও বাইরে থাকা দুর্গতদের খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। রাতে আট হাজারের বেশি মানুষের জন্য খাবারের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
এ পর্যন্ত বান্দরবানে পাহাড় ধসে পাঁচজন এবং বন্যার পানিতে ডুবে একজন মারা গেছেন। খাগড়াছড়িতে বন্যার পানি দ্রুত কমতে শুরু করেছে। সড়কের নিচু অংশ থেকে পানি সরে যাওয়ায় বিভিন্ন সড়কে ছোট যানবাহন চলাচল শুরু হয়েছে।
তবে দীঘিনালার মেরুং ইউনিয়ন ও মহালছড়ির নিম্নাঞ্চলে এখনো জলাবদ্ধতা রয়েছে। চেঙ্গী নদীর তীরবর্তী এলাকার ফসলি জমি পানিতে ডুবে গেছে।
দীঘিনালার ইউএনও তানজিল পারভেজ জানান, আশ্রয়কেন্দ্র থেকে সবাই বাড়ি ফিরে গেছেন।
চট্টগ্রামের বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী খাদ্যসামগ্রী, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও চিকিৎসাসেবা দিয়ে সহায়তা অব্যাহত রেখেছে। সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, বোয়ালখালী, হাটহাজারী ও ফটিকছড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে।
এদিকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানিয়েছে, বান্দরবান, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম, ফেনী, সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও জামালপুরে সদস্যরা দুর্যোগ মোকাবিলায় কাজ করছেন। বর্তমানে ৯০টি পয়েন্টে বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী উদ্ধার, ত্রাণ ও চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।
আর//দৈনিক দেশতথ্য// ঢাকা।
প্রিন্ট করুন








Discussion about this post